কবি মোহাম্মাদ রফিকের কয়েকটি কবিতা

বাংলাবাজার পত্রিকা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:৫৯ অপরাহ্ন, ১০ অগাস্ট ২০২৩ | আপডেট: ১১:০০ পূর্বাহ্ন, ১০ অগাস্ট ২০২৩
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

মোহাম্মদ রফিক একাধারে কবি, লেখক ও শিক্ষক ছিলেন। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কাব্যিক রসদ জুগিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছেন তিনি। মোহাম্মদ রফিকের জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯৪৩ সালে বাগেরহাটে।

১৯৬০-এর দশকে একজন মননশীল আধুনিক কবি হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে মোহাম্মদ রফিকের। তিনি একাধারে কবি, লেখক ও শিক্ষক। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন ও স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কবিতায় কাব্যিক রসদ জুগিয়ে তিনি বিখ্যাত হয়েছেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে ২০০৯-এ অবসর নেন।

আরও পড়ুন: “শব্দ ব্যঞ্জনায় ধ্বণিময় উচ্চারণ”

মোহাম্মদ রফিক একুশে পদক ছাড়াও বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জেমকন সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি ও পুরস্কার অর্জন করেছেন।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ‘কপিলা’, ‘খোলা কবিতা, ‘গাওদিয়া’, ‘মানব পদাবলি’, ‘আত্মরক্ষার প্রতিবেদন’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। 

আরও পড়ুন: কবিতা- “মায়ের কোলে”

পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন কবি মোহাম্মদ রফিক। রবিবার (৬ আগস্ট) বরিশাল থেকে ঢাকা ফেরার পথে তার মৃত্যু হয় বলে পারিবারিক সূত্র জানায়। মৃত্যকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি।

পাঠকের জন্য মোহাম্মাদ রফিকের কয়েকটি কবিতা-

নির্বাপণ

সে উৎসাহ মরে গেছে,

মরা-ইঁদুরের লেজ ধরে

শৈশবের বন্ধুদের তাড়া করে ফেরা

সেই সব প্রজাপতিদের পিছে-পিছে

গাছ-আগাছার ভিড়ে ছুটে চলা

দিন শেষে আঁধার ঘনিয়ে এলে

মন ভাঙা রঙ মেখে ঘরের দাওয়ায় উঠে আসা

দিন তো ফুরিয়ে যায় দিনের নিয়মে

রাত্রি তবে কারোই নিয়তি নয় শেষতক

আমি কিন্তু মরিনি এখনো।


শিশু

খোঁড়া হচ্ছিল কবর,

দৃশ্যটি দেখে শিশু জিজ্ঞাসা করে,

-আব্বা কী হচ্ছে ওখানে?

-কবর খোঁড়া হচ্ছে।

-কেন?

-তোমার দাদাকে মাটি দেয়া হবে।

-কেন?

-স্বর্গে যাবেন তাই।

-স্বর্গে গেলে কী হবে?

-পাপপূণ্যের বিচার হবে।

-আব্বা, আমি স্বর্গে যাব কবে?

-বৃদ্ধ হলে।

চিন্তায় পড়ে গেল শিশু।

হঠাৎ সে বলে উঠল কাঁদো কাঁদো স্বরে,

-আব্বা আমি স্বর্গে যাব না

দাদাও যাবে না

ওদের কবর খোঁড়া বন্ধ করতে বলো!

হতভম্ব পিতা শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল!


গন্ধ আসে

আদিতম হনন উত্সবে

মৃত্যুই আমার উপহার,

খণ্ড দেহ, মস্তিষ্ক, করোটি,

ফুল-ফলে, সাজিয়ে থালায়,

যেন বা পুজোর উপচার,

দরগাহ্য় মোম ও লোবাণ,

চন্দনে চর্চিত মাংসঘ্রাণ;

পৌঁছে যাই, পরির প্রাসাদে,

কত যুগ পেরিয়ে, এই তো

যদি তার চক্ষু ছুঁয়ে যায়

করুণায়, আবেগে আর্দ্র বা

ঈষৎ হাসির রেখা ঠোঁটে,

হতে পারে, বিদ্রূপে বঙ্কিম;

তবু, চন্দ্রকান্তি খেলে যায়

অগ্নিদগ্ধ মল্লিকা বিতানে,

জন্মের শূন্যের শূন্য উপচে

পূর্ণ হবে, প্রাণের আরতি;

এ যে দেখি, শবের স্বদেশ,

শুধু আমি, শ্বাস নিতে পারি;

বাজছে শঙ্খ, মসজিদে আজান,

শুনি, শুনে মুচড়ে ওঠে দেহ;

তখনও বধির হু-হুঙ্কার,

লাভাস্রোত হিমানী রক্তের

ধোঁয়াকুয়াশায় মাংসঘ্রাণ;

যেন কোনো স্বর্গীয় আরক!


যাত্রা, প্রভাতিয়া

জলতরঙ্গে ভাসে-ডোবে লাশ,

বরযাত্রী, আকাশি-যাত্রায়;

ভৈরবীতে, সুর ভাঁজে ওঁম,

কোথায়, সে কবে, মৃত্যু হল,

শিশুকণ্ঠ গেয়ে ওঠে, জয়,

পাপড়ি ভেজে প্রভাতী শিশিরে,

ঠমকে, গমকে, মীড়ে, লয়ে,

মন্দ্রিত মেঘের জ্বালে হোম;

দিগ্বধূর দু’টি চক্ষু ছেয়ে

প্লাবিত আকাশ ধরণির;

এই জন্মে, অমর যাত্রায়

বরযাত্রী, স্বর্গের দুয়ারে

শঙ্খধ্বনি, সূর্যের রশ্মিতে

প্রভাতিয়া, চুম্বন বাতাসে;

আজ তবে, দু’চোখে মিলন

অন্তরীক্ষে, তোমাতে-আমাতে;

চক্ষুর চক্ষুতে সৌরলোক

রক্তধারা লাল রক্ত নীল,

এবার, আমাকে হত্যা করো,

তোমাকেও হত্যা করি আমি,

সংগমের, মঙ্গল শীৎকারে;

কালান্তর দেহান্তর কালে

দেহ, বৃষ্টিধোয়া, ভস্ম বালু,

শব্দহীন নি:শব্দের বোল

অকূলের নক্ষত্রমিনারে;

যাও পাখি, উড়ি উড়ে যাও,

পারিজাত, তড়পায় হৃৎপিণ্ডে,

হলুদিয়া মন্দির আসমানি;

ব্যর্থ নয়, বিরহ-বাসর!