এক বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দের আদেশ দিলেও অর্থ ফেরত আনা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা বিপুল অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আইনি তৎপরতা শুরু হয়েছে দেশে। গত এক বছরে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক মন্ত্রী, এমপি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীন মহলের সুবিধাভোগীদের দেশ-বিদেশে থাকা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে আদালতের আদেশে সম্পদ জব্দ হলেও এর বড় অংশ এখনো আইনি জটিলতা ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের কারণে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সম্পদ জব্দ করাই যথেষ্ট নয়; দ্রুত বিচারিক নিষ্পত্তি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সম্পদ স্থানান্তরের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দৃশ্যমান ফল দেবে না। তাদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দক্ষ আইনি কৌশলের সমন্বয় ছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন: পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনে মোসলেহ উদ্দিন সভাপতি ও শামীমা পারভীন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালজুড়ে দেশের বিভিন্ন আদালত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার দেশীয় সম্পদ জব্দের আদেশ দেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় থাকা বহুতল ভবন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক প্লট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার এবং বিপুল পরিমাণ জমিজমা। পাশাপাশি বিদেশে থাকা আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ফ্রিজ বা জব্দে বিভিন্ন দেশের সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
আলোচিত সম্পদ জব্দের ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক–এর সম্পদ নিয়ে দুদকের পদক্ষেপ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গাজীপুরের ফাওকাল এলাকায় তার বিশাল বাগানবাড়ি, ডুপ্লেক্স ভবন এবং রাজধানীর অভিজাত এলাকায় থাকা একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হয়েছে। বারিধারা ডিওএইচএসের বহুতল ভবন এবং বারিধারা পার্ক ভ্যালির বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টও জব্দ তালিকায় রয়েছে।
আরও পড়ুন: মাধবপুরে ২ কোটি টাকার ভারতীয় চিংড়ির রেনু জব্দ, খোয়াই নদীতে অবমুক্ত
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এসব সম্পদের অনেকগুলোই প্রকৃত মালিকানা গোপন করতে আত্মীয়স্বজন, ব্যবসায়িক অংশীদার কিংবা বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত ছিল। তদন্তে আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব ও কর নথির অসঙ্গতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিদেশে সম্পদ জব্দের ক্ষেত্রেও কিছু অগ্রগতি এসেছে। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ–এর যুক্তরাজ্যে থাকা বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসার পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তার মালিকানাধীন শত শত বাড়ি ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়। যুক্তরাজ্যের National Crime Agency (এনসিএ) প্রায় ১ হাজার ২৫ কোটি টাকা মূল্যের ৩৪৩টি বাড়ি এবং আরও কয়েক কোটি টাকার সম্পদ ফ্রিজ করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকের তথ্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতেই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এ পদক্ষেপ নেয়।
তবে বিদেশে থাকা সম্পদ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে। দুদকের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, আদালতের আদেশ পেলেই বিদেশি রাষ্ট্র সম্পদ হস্তান্তর করে না। প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন, প্রমাণের মানদণ্ড এবং অর্থপাচারবিরোধী কাঠামো অনুসরণ করতে হয়। ফলে আইনি লড়াই দীর্ঘমেয়াদি হয়ে দাঁড়ায়।
তানজীর আহমেদ গণমাধ্যম কে বলেন, বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও জব্দের ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য এলেও সম্পদ ফিরিয়ে আনার রেকর্ড এখনো সীমিত। কারণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপর পুরো প্রক্রিয়া নির্ভর করে।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম গণমাধ্যম কে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে জব্দ দেখানো হলেও বাস্তবে সম্পদের দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘ আইনি লড়াই, মালিকানা বদল কিংবা বিদেশি আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করেন। ফলে তদন্তের পাশাপাশি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী প্রসিকিউশন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে দুর্নীতির মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় জব্দ সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা হয় না। এতে অনেক সম্পদ অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হয় কিংবা আইনি জটিলতায় আটকে থাকে। তাদের মতে, দুর্নীতির মামলার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, সময়সীমাবদ্ধ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছ নীতিমালা জরুরি।
জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী সমন্বয় কমিটির সাবেক জেলা জজ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. শাহজাহান সাজু গণমাধ্যম কে বলেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কেবল প্রতীকী অভিযান নয়, কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রয়োজন। তার ভাষায়, “জব্দ করা সম্পদ দ্রুত রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যুক্ত করতে না পারলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচারের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আর্থিক সুশাসনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তে ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ আস্থার সংকটে পড়বে।
সুশাসনবিষয়ক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অবস্থান কার্যকর করতে হলে তদন্ত সংস্থা, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, কর কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্তের তথ্য জনগণের সামনে নিয়মিত প্রকাশ করারও দাবি উঠেছে।
বর্তমানে দেশে আলোচিত দুর্নীতির মামলাগুলোর বড় অংশই রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ কমিশন বাণিজ্য, সরকারি প্রকল্পে লুটপাট, ভূমি দখল ও অর্থপাচার সংশ্লিষ্ট। তদন্তকারীরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন সময়ে বিদেশে পাচার হয়ে আবাসন, ব্যাংক আমানত, শেল কোম্পানি ও অফশোর বিনিয়োগে রূপান্তরিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতায় সম্পদ জব্দের সাম্প্রতিক উদ্যোগ রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পদের নিরাপত্তা আর নিশ্চিত নয়। তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে সেই সম্পদ জনগণের কোষাগারে ফিরিয়ে আনতে পারে, সেটিই হবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রকৃত সাফল্যের





