বিমাখাতে হাজারো অভিযোগ
১০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দাবি পরিশোধের দায় বীমা কোম্পানিগুলোর কাঁধে
দেশের বীমা খাত এখন চরম আস্থার সংকটে রয়েছে। এক বছর আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কতৃপক্ষ (আইডিআরএ) স্বয়ং মোট ৮২টি বীমা কোম্পানির মধ্যে ৩২টিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি জীবন বীমা এবং ১৭টি সাধারণ বীমা কোম্পানি রয়েছে। সময়মতো দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা, পর্ষদে কোন্দল এবং দুর্বল ব্যবসায়িক অবস্থার কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এমতাবস্থায়, বীমা খাতে দূর্ভোগের শিকার লাখ লাখ গ্রাহককে সুরক্ষা দিতে উপায় বের করার লক্ষ্য নিয়ে আইডিআরএ-এর নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এ সপ্তাহেই বসছেন লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে। আগামী বৃহস্পতিবার দুই দফায় পৃথক শিডিউলে এমডি-সিইওদের ডাকা হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে আইডিআরএ’র নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, আমার পরিকল্পনায় রয়েছে গ্রাহকের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া। ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহকদের কিভাবে সুরক্ষা দেয়া যায়, এ সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স আরও উন্নত করা যায় এবং পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থারও জবাবদিহীতা কিভাবে বাড়ানো যায় -তাই নিয়ে আমার অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে ‘মুভিং ফরওয়ার্ড’ কনসেপ্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছি আমি। সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসার শিডিউল হয়েছে। আশা করছি আমরা ইতিবাচকভাবে সামনে এগুতে পারবো।
আরও পড়ুন: রূপালী ব্যাংকের এমডির বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা তসরুফের প্রমাণ
বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকট পলিসি ম্যাচুরিটি বা মেয়াদ পূর্ণ হলে গ্রাহকের দাবি পরিশোধে কোম্পানিগুলোর টালবাহানা। আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে বীমা কোম্পানিগুলো প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করলেও দাবি পরিশোধ করেছে মাত্র ২ হাজার ২২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংগ্রহ করা প্রিমিয়ামের অর্ধেকেরও কম গ্রাহকদের কাছে ফিরে গেছে। একই সময়ে মোট বকেয়া দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। খাতটির গড় দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ।
জীবন বীমা খাতে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন—মাত্র তিন মাসে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে জমা হওয়া দাবির মধ্যে ৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। মোট দাবির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই গ্রাহকরা পাননি। অন্যদিকে সাধারণ বীমা খাতে ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩ হাজার ৬০৪ কোটি টাকার দাবির মধ্যে ৩ হাজার ৩০৫ কোটি টাকাই অনিষ্পন্ন ছিল। অর্থাৎ প্রায় ৯২ শতাংশ দাবি ঝুলে ছিল।
আরও পড়ুন: পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পুনঃনির্বাচিত মনজুরুর রহমান
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রাহকের নিকট থেকে পলিসির বিপরীতে মাসিক বা ত্রৈমাসিক কিস্তি হিসেবে আদায়কৃত প্রিমিয়ামের টাকা বীমা কোম্পানির মালিকেরা অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। সেইসকল অর্থ সাবসিডিয়ারী কোম্পানিতে বিনিয়োগের নামে দেশ থেকে পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে।
সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সরাসরি কোনও বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে না। এজন্য নির্ভর করতে হয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) উপর। কিন্ত ওই নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতেও নেই পর্যাপ্ত ক্ষমতা। আইডিআরএ কোনও গুরুতর অভিযোগ পেলে বীমা কোম্পানিকে বড়জোর জরিমানা করতে পারে বা পর্ষদ ভেঙে দিতে পারে । কিন্ত নতুন করে পর্ষদ গঠনের ক্ষমতা এই সংস্থার হাতে নেই। কোনও বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষেরও কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ পেলে তিরস্কার করা ও জরিমানা আদায়ের বেশি কিছু করতে পারে না আইডিআরএ। বড়জোর কাউকে সাময়িক বরখাস্ত করলেও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে না আইডিআরএ।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বর্তমান আইনি কাঠামোতে আইডিআরএর শাস্তিমূলক ক্ষমতা সীমিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা সতর্কবার্তা, তিরস্কার ও আর্থিক জরিমানার মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারে। গুরুতর আর্থিক অপরাধ বা প্রতারণার অভিযোগে ফৌজদারি বিচারের জন্য তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দুদক বা আদালতের ওপর নির্ভর করতে হয়—যা বীমা খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা। এজন্য ২০২৫ সালে প্রস্তাবিত ‘ইনসুরেন্স রেজুলেশন অ্যাক্ট-এ আইডিআরএ চেয়ারম্যান-কে, বীমা কোম্পানির পরিচালক, সিইও ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের অপসারণ বা প্রতিস্থাপনের মতো অধিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
এদিকে, বছর কয়েক আগে থেকেই বীমা কোম্পানিগুলোর লাখ লাখ গ্রাহকের বিক্ষোভ-আন্দোলনের মুখে দেশীয় বীমা কোম্পানির বেশিরভাগেরই আর্থিক ভিত ভেঙে পড়ার চিত্র সামনে চলে আসায় ২০২৫ সালে বীমা আইন সংশোধনের মতো সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। কিন্ত সংস্কারের সূপারিশ ফাইলবন্দী হয়ে আছে।
আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, বায়রা লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, সানলাইফ এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ—এই ছয়টি কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহকদের প্রায় ৩ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকার অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ১১ লাখ পলিসিধারীর পাওনা অর্থ আটকে আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু ফারইস্ট ইসলামী লাইফের কাছেই গ্রাহকদের পাওনা প্রায় ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে আইডিআরএ ১৫টি জীবন বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে বিশেষ নিরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল আর্থিক অনিয়ম, দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা এবং অর্থ সরানো।
বছরের পর বছর ধরে মেয়াদপূর্তির অর্থ কিংবা মৃত্যুদাবির টাকা না পেয়ে বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম নেওয়ার সময় দ্রুত সেবা দিলেও টাকা ফেরতের সময় নানা অজুহাত দেখায়।
অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা আইডিআরএতে অভিযোগ করলেও কার্যকর সমাধান পাননি। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবি থাকা সত্ত্বেও আইডিআরএ মাত্র ২২টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বীমা খাতের এই পরিস্থিতিতে আস্থাহীনতার একটি বড় সূচক হলো পলিসিধারীর সংখ্যা হ্রাস। আইডিআরএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১০ লাখের বেশি গ্রাহক জীবন বীমা ত্যাগ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা, দুর্বল তদারকি এবং করপোরেট সুশাসনের অভাব এর প্রধান কারণ।
তবে পুরো খাতের চিত্র একরকম নয়। আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জীবন বীমা খাতের মোট প্রিমিয়াম আয় বেড়ে ১৩ হাজার ৯৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। বাজারে কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে ভালো সুশাসন, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি এবং ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে। বিশেষ করে বহুজাতিক বা পেশাদার ব্যবস্থাপনা কাঠামোর কিছু কোম্পানি নিয়মিত অডিট, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকসেবা উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স থাকলে বীমা ব্যবসা টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বহু প্রতিষ্ঠানে একই ব্যক্তি বা একই গোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ করছে। কোথাও কোথাও মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্ত এবং দায় নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বীমা খাতে অনিয়ম নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠলেও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা খুব কমই দেখা গেছে। যদিও আইডিআরএ ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলো চিহ্নিত করেছে, বিশেষ নিরীক্ষা শুরু করেছে এবং নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তবু ভুক্তভোগীদের মতে কার্যকর শাস্তি ও দ্রুত অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা এখনও দৃশ্যমান নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাতটি পুনরুদ্ধারে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি—প্রথমত, দাবি পরিশোধে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা; দ্বিতীয়ত, পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা; এবং তৃতীয়ত, পলিসিধারীদের সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী গ্যারান্টি বা রেজোলিউশন ব্যবস্থা চালু করা।
মানুষের সঞ্চয় সুরক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয় বীমা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই দেশীয় বীমা খাতকে ঘিরে বাড়ছে অভিযোগ, অনিয়ম এবং গ্রাহক হয়রানির ঘটনা। প্রিমিয়াম আদায়ে সক্রিয় হলেও অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে দাবি নিষ্পত্তিতে গড়িমসি, মেয়াদপূর্তির পর অর্থ ফেরত না দেওয়া এবং গ্রাহকদের বছরের পর বছর হয়রানির ফলে কয়েক বছর আগে থেকেই বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে নেমে আসে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার বীমা কোম্পানির ব্যবসায় এজন্ট প্রথার বদলে ব্যাংকাসুরেন্স চালু করে ব্যাংকের মাধ্যমে বীমা পলিসি করার ব্যবস্থা উম্মোচন করলেও তা জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি।
আইডিআরএর সাবেক চেয়ারম্যান গত মার্চে পদত্যাগের পুর্বে ড. এম আসলাম আলম একাধিক গণমাধ্যমকে বলেছেন, বাংলাদেশের বীমা খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রিমিয়াম আয় বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে অনিষ্পন্ন দাবি, গ্রাহকের ক্ষোভ এবং আস্থাহীনতা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—গ্রাহকের টাকা ফেরত নিশ্চিত করা এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। অন্যথায় বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমবে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তার পুরো কাঠামো।





