প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলিতে আসছে নতুন ব্যবস্থা, চার স্তরের কমিটি গঠনের উদ্যোগ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভোগান্তি, অনিয়ম, তদবির ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় উপজেলা, জেলা, বিভাগ এবং সিটি করপোরেশন—এই চার স্তরে পৃথক কমিটির মাধ্যমে বদলির আবেদন নিষ্পত্তি করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি কমিটিতে স্থানীয় পর্যায়ের দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সদস্য হিসেবে রাখা হবে। এসব কমিটি বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। মাসে অন্তত একবার বৈঠক আয়োজন বাধ্যতামূলক থাকবে এবং বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে শিক্ষকদের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: যবিপ্রবিতে ক্যাম্পাস অ্যাক্টিভেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে তরুণদের ক্ষমতায়নে কাজ করছে বিজমেকার
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের জটিলতা ও হয়রানি অনেকাংশে কমতে পারে। তবে স্থানীয় পর্যায়ের সদস্য নির্বাচনে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রাধান্য পেলে কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের কমিটির কাছে আবেদন জমা দেওয়া হবে এবং এসব কমিটি মাসিক সভার মাধ্যমে আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
আরও পড়ুন: বার্মিজ ভাষা প্রশিক্ষণ প্রকল্পে সাফল্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায় ইউনেস্কো
তিনি আরও বলেন, অতীতে শিক্ষক বদলিকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির ক্ষেত্র গড়ে উঠেছিল। সেই সুযোগ বন্ধ করতেই বদলি ব্যবস্থাকে স্থানীয় প্রশাসনের আওতায় আনা হচ্ছে, যাতে দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করা যায়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদের মতে, শিক্ষক বদলি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এতে বদলি-পদায়নকে ঘিরে অস্থিরতা কমবে এবং অনিয়ম ও দুর্নীতিও হ্রাস পাবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের সদস্য নির্বাচন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ না হলে প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ও তদবিরের সুযোগ থেকেই যাবে। ফলে প্রত্যাশিত সংস্কারের সুফল পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, একই উপজেলা বা থানার মধ্যে বদলির আবেদন প্রথমে উপজেলা বা থানা পর্যায়ের কমিটিতে বিবেচিত হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সদস্য-সচিব হিসেবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটির অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বদলির আদেশ জারি করবেন।
একই জেলার ভিন্ন উপজেলায় বদলির আবেদন জেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন এ কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা), জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সদস্য-সচিব হিসেবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা থাকবেন।
একই বিভাগের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলির ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি আবেদন নিষ্পত্তি করবে। এতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সদস্য-সচিব হিসেবে বিভাগীয় উপপরিচালক (প্রাথমিক শিক্ষা) দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশনভিত্তিক বদলির জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের কমিটি কাজ করবে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রাজস্ব) এর সভাপতি থাকবেন। কমিটিতে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (বিদ্যালয়), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন), দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সদস্য-সচিব হিসেবে পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) থাকবেন।
জানা গেছে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনলাইনে জমা হওয়া বদলির আবেদন উপজেলা ও জেলা পর্যায় অতিক্রম করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হতো। অধিদপ্তরের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর বদলি কার্যকর করা হতো। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর তদবির, হয়রানি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে শিক্ষাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বা গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা গেলে বদলি প্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অন্যথায় পুরোনো সমস্যাগুলোর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে। ফলে নতুন ব্যবস্থার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে সদস্য নির্বাচনের স্বচ্ছতা, কমিটির নিরপেক্ষতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক তদারকির ওপর।





