ডগরতলির জলে ভেসে প্রকৃতির সান্নিধ্যে
নদীমাতৃক বাংলাদেশে আমাদের নদীসমূহ ঋতুভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। রূপবৈচিত্র্যের দিক থেকে বাংলাদেশের নদীসমূহের রূপমাধুর্যে যেকোনো মানুষই যে মুগ্ধ হবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আজ আমার ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে আছেন সাংবাদিক ও সহকর্মী তাহমিদ হাসান, সাংবাদিক রাজিউল ইসলাম শান্ত, সাংবাদিক শামীম রেজা ও সাংবাদিক জান্নাতুল লামিশা। চলছি নৌভ্রমণের উদ্দেশ্যে ডগরতলির পানে।
দুপুরে বরাবরের মতোই অফিসে একের পর এক সহকর্মী এসে উপস্থিত। প্রত্যেকের চেহারায় নির্ঘুমের ছাপ, কারণ সবাই আজ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে নির্ঘুম, ক্লান্ত শরীর নিয়ে উপস্থিত। ক্লান্ত বলেই হয়তো আজ লামিশার মাথায় ভ্রমণের ভূত একটু বেশি চেপে বসেছে। সে জানিয়ে দিল, এখন সবাই নৌকাভ্রমণে যাব। প্রথমে সবার কিছুটা আগ্রহে ঘাটতি থাকলেও সেই অনাগ্রহ বেশিক্ষণ টিকল না। বেশ হৈ-হুল্লোড় করে অফিসে উপস্থিত পাঁচজন সহকর্মী ছুটে চললাম নৌকাভ্রমণের উদ্দেশ্যে।
আরও পড়ুন: ঢাবিতে বাংলা কিউআর বিষয়ে সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে এক রিকশায় পাঁচজন উঠে যাত্রার শুভ সূচনা করলাম। সূর্যমামার প্রখরতা পুরো সড়কজুড়ে। আমরা নৌভ্রমণের লক্ষ্যে পৌঁছালাম ডগরতলী ঘাটে। ঘাটে পৌঁছাতেই মাঝিদের হাঁক শুনতে পেলাম। দুপুরবেলা হওয়ায় মাঝিরাও বেশ অলস সময় পার করছিলেন। দরদাম করে আমরা উঠে পড়লাম ছই দেওয়া নৌকায়। ডগরতলির টলমল পানিতে ভেসে বেড়াতে লাগলাম আমরা। পূর্বের হাওয়া সঙ্গে নিয়ে আমাদের নৌকা চলছে এগিয়ে। নৌকায় উঠেই শুরু হলো লামিশার ফটোশুট। নৌকার মাঝি আমাদের এগিয়ে নিয়ে চলছেন। নদীকে কেন্দ্র করে চারদিকে গড়ে উঠেছে বসতভিটা। কিছু ডিঙি নৌকায় জেলেরা মাছ ধরছেন, কিছু নৌকা যাত্রী পারাপারের ব্যস্ততায় ছুটে চলেছে।
আমরা ঢেউয়ের তালে তালে এগিয়ে চলছি। যেহেতু শামীম ছাড়া আমাদের কেউ সাঁতার জানি না, তাই মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম। আমি যে সাঁতার পারি, তাকে সাঁতার ছাড়া অন্য কোনো নাম দেওয়া যেতে পারে। তবে সব ভয় জয় করে আমরা চলছি সামনে। নদীপারের মানুষের জীবনধারা আমাদের খুব চমকে দিয়েছিল। আমাদের মাঝি চাচাকে শান্ত স্মার্টফোনে কীভাবে ছবি তুলতে হয়, তা বেশ ধৈর্যের সঙ্গে শেখাচ্ছিল। মাঝি চাচাও মনোযোগ দিয়ে তা দ্রুত শিখে ফেলেন। পরবর্তীতে চাচা আমাদের বেশ সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দেন।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড: কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ঢাবি
চাচার সঙ্গে গল্পে গল্পে জানলাম, এই অঞ্চলে তাঁদের পরিবার দুই-তিন প্রজন্ম ধরে নৌকা চালান। তিনি আরও বললেন, “বাবা, আগে কী সুন্দর ছিল, আর এখন কী! এখন কলকারখানার দূষণ বেড়ে যাওয়ার ফলে আগের মতো মাছও পাওয়া যায় না। আগে অনেক প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত।” এরপর চাচা খালি গলায় গান ধরলেন। চাচার গান আর নিসর্গ পরিবেশের মাঝ দিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি।
নৌকায় বসে আমরা জীবন নিয়ে নানাবিধ গল্প করতে লাগলাম। আমাদের গল্পে কখনো উঠে আসছে একাডেমিক চাপের হতাশা, আবার কখনো অনাগত ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় সুসময়ের কথা। সবার হাতে লাল চা আর আনন্দ বাদাম। তাহমিদ ভাই আর শান্ত একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছেন—কখনো আমাদের, কখনো নদী-নৌকার, আবার কখনো নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের।
মাঝেমধ্যে ঢেউয়ে নৌকা একটু বেশি দুলে উঠলে আমরা সবাই একটু ভয়ই পাচ্ছিলাম, যেহেতু একজন ছাড়া কেউই সাঁতার জানি না। আমাদের শামীম অভয় দিল, “ভয় পাবেন না, কিছুই হবে না। আমি সাঁতার পারি, আমি সবাইকে উদ্ধার করব।” চারদিকের নিসর্গ পরিবেশ, শীতল বাতাস আর শামীমের অভয়ে মনের মধ্যে জমতে বসা ভয় কর্পূরের মতো উবে গেল। নৌকার বৈঠা যত পানিতে আঘাত করে, আমাদের হাসি-গান-গল্পের ফোয়ারা ততই ঝরতে থাকে। আরও বেশ কিছু সুন্দর স্মৃতি নিয়ে সেদিনের মতো শেষ হয় আমাদের নৌভ্রমণ।
এখানে ঘণ্টা হিসেবে নৌকা, স্পিডবোট ও কায়াক ভাড়া দেওয়া হয়। প্রতি ঘণ্টা নৌকাভ্রমণের ভাড়া পড়বে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। দুজনের জন্য কায়াকিংয়ের খরচ প্রতি ঘণ্টায় ৩০০ টাকা।
ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন নৌভ্রমণে
রাজধানীর যেকোনো স্থান থেকে প্রথমে আপনাকে আসতে হবে নবীনগর কিংবা বাইপাইলে। এরপর রিকশায় কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহনে সেখান থেকে যেতে হবে ডগরতলী খেয়াঘাটে। ঘাটে গেলেই পেয়ে যাবেন নৌকার দেখা। সেখান থেকে দরদাম করে উঠে পড়ুন নৌকায়।





