যানজট নিরসনে মানা হচ্ছে না প্রধানমন্ত্রীর একগুচ্ছ নির্দেশনা
ঢাকার যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর দফায় দফায় উচ্চপর্যায়ে বৈঠক করে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ঢাকার প্রধান চারটি বাস টার্মিনালের পাশে অবৈধভাবে এলোমেলো বাস পার্কিং সড়কের সর্বত্র দোকানপাট, অবৈধ স্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি উন্নয়ন মেরামত ও অন্যান্য সংস্থার সেবামূলক পাইপ লাইন স্থাপনের জন্য বছরের পর বছর খোঁড়াখুঁড়িতে ফেলে রাখা সড়কগুলো এখন যন্ত্রণার পাশাপাশি আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বলছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তারা কাজ করছে।
সরজমিন পরিদর্শন ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সড়কে অবৈধ বাস পার্কিং ও যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামার কারণে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তীব্র যানজট ও চরম জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মূল সড়কের ওপরে ও পাশের রাস্তা দখল করে বাস রাখা হয়। বাসগুলো নির্ধারিত স্থানে না রেখে রাস্তার ওপর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় চলাচলরত অন্যান্য গাড়িগুলোর গতি কমে যায়। এতে সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং চরম দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা।
আরও পড়ুন: ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে খুলবে শহীদ জিয়া শিশু পার্ক
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর বঙ্গবাজার মোড়ে তীব্র যানজট। মোটরসাইকেলে বসে সামনে এগোনোর পথ খুঁজছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজীর হোসাইন। চোখের সামনে সড়কের দুই পাশে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে। চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। রাস্তায় বাস পার্কিং কেন? দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যকে প্রশ্ন করেন তানজীর।
জবাবে পুলিশ সদস্য বলেন, আমরা পারি না, আপনি একটু বাইক থেকে নাইম্যা বাসগুলো সরায়া দ্যান। গত ৩১ আগস্ট দুপুরের ঘটনা এটি। কথোপকথনের সময় সেখানে এই প্রতিবেদকও উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেলে তিন কারাবন্দীর মৃত্যু
তানজীর হোসাইন পরে বলেন, সড়কে বাস পার্কিংয়ের কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে, অথচ তা নিয়ে পুলিশের এমন গা ছাড়া বক্তব্যে হতাশ হয়েছি। তবে রাজধানীর বঙ্গবাজার মোড়ের ওই দৃশ্য বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
একইদিন বঙ্গবাজার থেকে গুলিস্তান মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিটার সড়কের দুই পাশ কার্যত বাসের পার্কিংয়ে পরিণত হয়েছে। শুধু বাস দাঁড়িয়ে থাকাই নয়, সড়কে বাস পার্কিং নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন লাইনম্যানও। ব্যস্ত এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করেন। এমন একটি এলাকায় সড়কের বড় অংশজুড়ে দিনের পর দিন বাস দাঁড়িয়ে থাকলেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এদিন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়কের নিচে বঙ্গবাজার মোড় থেকে গুলিস্তান মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিটার সড়কের দুই পাশের লেনে অন্তত ৭৪টি বাস পার্কিং করা। কোন বাস কোথায় দাঁড়াবে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায় কয়েকজনকে। স্থানীয়ভাবে তাঁরা লাইনম্যান হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের বাস পার্কিংয়ের জন্য তাঁদের সেখানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। ব্যস্ত সড়কের জায়গা এভাবে বাসের সারিতে ভরে যাওয়ায় যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দিনের ব্যস্ত সময়ে বঙ্গবাজার ও গুলিস্তান এলাকায় যানজট আরও তীব্র হয়। একই অবস্থা মহাখালী সায়েদাবাদ গাবতলী ও আরামবাগ উত্তর এলাকায়।
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার আকরাম হোসেন বলেন, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ প্রতিদিনই অবৈধ পার্কিং বিরোধী অভিযান যানজট নিরসনে নানা পরিচালনা করছি। অবৈধ চালক ও গাড়ির বিরুদ্ধে মামলাসহ ক্ষেত্রবিশ্বাসের ডাম্পিং করা হচ্ছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তারা কাজ করছে। ঢাকার যানজট কমাতে গত ১৫ জুন রাজধানীর ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করে কেরানীগঞ্জে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এর আগেও টার্মিনালটি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে সেটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে চলা এই অব্যবস্থাপনায় যানজটের চাপ বাড়ছে, ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারী, যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল যদি আসলেই সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় তাহলে এই এলাকার যানজট অনেকটাই কমে আসবে। তবে গুলিস্তান মোড়ের সামনে উড়ালসড়কের নিচে তুলনামূলক সরু একটি জায়গায় মোটরসাইকেল রেখেছিলেন বেসরকারি সংস্থার কর্মী শাহাদাত হোসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন বাস পার্কিংয়ের লাইনম্যান খাইরুল। শাহাদাত বলেন, মোটরসাইকেল রেখে তিনি কাছের একটি টয়লেটে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পর বাস পার্কিংয়ের লাইনম্যান খাইরুল তাঁর সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। পরে আরও একজন ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগ দেন। একপর্যায়ে তাঁরা মারমুখী আচরণ করেন।
শাহাদাত হোসেন বলেন, আমি বাইকটি রেখে তিন মিনিটের মতো হবে টয়লেটে গিয়েছিলাম। ফিরে আসার পর তাঁরা আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে এবং বাইক রাখার জন্য টাকা চায়। আমি পরিচয় দিলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। তাঁরা বলে, এটা আমাদের বাস পার্কিংয়ের জায়গা। ব্যস্ত একটি সড়কের জায়গা কীভাবে একটি গোষ্ঠী নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে পার্কিংয়ের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করে, আর তা দেখার কেউই থাকে না? এভাবে প্রশ্ন তোলেন শাহাদাত। গুলিস্তান শুধু একটি বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক এলাকা নয়। এটি রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র। ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল দিয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১৭ জেলার মানুষ যাতায়াত করেন। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তান এলাকা থেকে এই অঞ্চলের বাসের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে গুলিস্তান পাইকারি পণ্যের বড় বাজার হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের চাপও বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এলাকাটিতে যাত্রীর চাপের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। এই চাপের মধ্যে সড়কের দুই পাশে বাস পার্কিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
তবে ফুলবাড়িয়ার জাকের সুপার মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী হায়দার আলী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা তাঁদের মার্কেটে কাপড় কিনতে আসেন। কিন্তু মার্কেটের সামনের সড়কে বাস পার্কিং করে রাখায় যানজট তৈরি হয়।
তিনি বলেন, যানজটের কারণে ক্রেতারা ভোগান্তিতে পড়েন, আমরাও সমস্যায় থাকি। এটার একটা স্থায়ী সমাধান হওয়া জরুরি। ঢাকার যানজট কমাতে ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের উদ্যোগ নতুন নয়। এর আগেও টার্মিনালটি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে টার্মিনাল সরানো গেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে বাস ও আন্তজেলা যানবাহনের চাপ কমবে এবং যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের (ট্রাফিক) অতিরিক্ত কমিশনার এহসানুল কামরান তানভীর বলেন, বাস পার্কিংয়ের কারণে এই এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। মাঝে ডিসি স্যার এটা বন্ধ করেছিলেন। তবে আবার বাস পার্কিং শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ওই এলাকার বাস টার্মিনাল আগামী চার মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এটা বাস্তবায়ন হলে সমস্যার সমাধান হবে। তিনি আরও বলেন, ট্রাফিকের পক্ষ থেকে আমরা চেষ্টা করছি, জনভোগান্তিতে কমাতে। এটা সবসময় অব্যহত থাকবে বলে জানান তিনি। এদিকে ঢাকার মেট্রোরেল ও ওয়াসার পাইপ স্থাপনের কারণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ গুলশান বনানী বারিধারা নতুন বাজার বিশ্বরোড এলাকায় রামপুরা বাড্ডা রোড বছরের পর বছর ধরে খোঁড়াখুঁড়ি করে রাখায় যান চলাচলের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে।





