গার্মেন্ট আন্দোলনে হঠাৎ আগারগাঁও শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধে নগরে তীব্র যানজট-ভোগান্তি

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৬:২৪ অপরাহ্ন, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৬:২৯ অপরাহ্ন, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের কারণে নগরজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে যানবাহন আটকে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হচ্ছে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারী যাত্রীদের। এতে পুরো নগরের স্বাভাবিক চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

এর আগে পুরোনো গবেষণার মাঠ পুনরুদ্ধারের দাবিতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) সহস্রাধিক শিক্ষার্থীদের আবারও সড়ক অবরোধ কারণে যান চলাচল বন্ধ ও তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর চীন মৈত্রী সিগন্যাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন তারা। এতে রাজধানীর আগারগাঁও, শিশুমেলা, আসাদগেট, ফার্মগেট, উড়োজাহাজ ক্রসিংসহ তেজগাঁও এলাকার বিস্তীর্ণ সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রী ও সাধারণ মানুষ। হাসপাতালগামী সড়কে ভোগান্তিতে পড়তে দেখা যায় রোগী ও স্বজনদের। দীর্ঘ সময় অবরোধের পর দুপুর ২টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক থেকে অবস্থান তুলে নিলে যান চলাচল পুনরায় শুরু হয়। তবে কয়েক ঘণ্টা সড়ক কার্যত স্থবির থাকায় যানজটের রেশ থেকে যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অবরোধ সরিয়ে নিয়েছে। সড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে। তবে চাপ রয়ে গেছে। যানজট কমে সড়ক গতিশীল হতে একটু তো সময় লাগবে। ট্রাফিক তেজগাঁওয়ের মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন যান চলাচল গতিশীল করতে। তবে শিক্ষার্থীরা জানান, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তি। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহৃত এই মাঠ পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। সড়ক অবরোধের পাশাপাশি আজ শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণপূর্ত কমপ্লেক্সের সামনে কুশপুত্তলিকা দাহ করারও ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

আরও পড়ুন: ডিএসসিসির জরিপে ডেঙ্গুর অধিক ঝুঁকিতে ২৯ ওয়ার্ড, লার্ভা মিলেছে ৩২২ বাড়িতে

জানা গেছে, নির্দিষ্ট দাবিতে শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। এতে প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে আশপাশের সড়ক ও বিকল্প পথেও যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। ফলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ যানজট ছড়িয়ে পড়ে। এতে সড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বাস, প্রাইভেটকার, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রয়েছে। অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে যানবাহন থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা। অবরোধের কারণে অফিসগামী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। শিক্ষার্থীদেরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষকে পড়তে হয়েছে চরম বিড়ম্বনায়। বিশেষ করে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়। ভুক্তভোগী যাত্রী হইববুর রহমান সরদার বলেন, সামান্য পথ যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগছে। কখন যান চলাচল স্বাভাবিক হবে, তা বুঝতে পারছি না। এতে আমাদের কর্মঘণ্টা ও মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। নগরবাসীর অভিযোগ, সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোনো সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে জনদুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সচেতন মহলের মতে, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের অবরোধে নগরবাসীর ভোগান্তি আরও বাড়বে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আন্দোলনকারীদের কর্মসূচির কারণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। বিশেষ করে আগারগাঁও থেকে শিশুমেলা, আসাদগেট ও ফার্মগেটমুখী যানবাহন চলাচলে স্থবিরতা দেখা দেয়। একইভাবে আশপাশের সংযোগ সড়কগুলোতেও যানবাহনের চাপ বাড়ে। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থেকে দুর্ভোগ পোহাতে হয় কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও অফিসগামী যাত্রীদের।

আরও পড়ুন: রাজধানীতে বাস-লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষ, নারীসহ নিহত ৪

এর আগে মঙ্গলবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এক মতবিনিময় সভায় সব পর্যায়ের পরীক্ষা বর্জন এবং বেলা ১১টার পর সব ধরনের ক্লাসে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাটডাউনের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেখানে সচিবালয় নির্মাণের উদ্দেশ্যে মাটি পরীক্ষার কাজ শুরু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ উপেক্ষা করে এ ধরনের কার্যক্রম চালানোর প্রতিবাদেই তারা আন্দোলনে নেমেছেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয় গত ২৭ অক্টোবর। ওই দিন পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তি দাবি করে তা হস্তান্তরের দাবিতে ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। একপর্যায়ে মাঠে সচিবালয় নির্মাণের উদ্দেশ্যে চলমান মাটি পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও গাড়ি জব্দ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন আন্দোলনকারীরা। পরদিন ২৮ অক্টোবর মাঠে চলমান মেলার কার্যক্রম বন্ধের আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। এর পরদিন মাঠের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির মধ্যে ২৯ অক্টোবর সড়ক অবরোধ করেন তারা। ওই দিনই জাতীয় যুব মেলাসহ মাঠে চলমান সব ধরনের মেলা স্থগিতের ঘোষণা দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।

তবে মেলা স্থগিতের ঘোষণা এলেও মাঠের স্থাপনা অপসারণ না করা এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অজ্ঞাতনামা মামলা দায়েরের প্রতিবাদে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় গত ২ নভেম্বর চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে মাঠটি নিজেদের দখলে নেওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। তারা মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মেলা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হলেও মাঠের স্থাপনা অপসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে মাঠটি হস্তান্তরের বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।