ব্যবসায়ীরা ডলার সংকটে এলসি খুলতে পারছেন না

Shakil
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৪:১৬ অপরাহ্ন, ২৭ অক্টোবর ২০২২ | আপডেট: ৭:১০ পূর্বাহ্ন, ০৫ নভেম্বর ২০২২
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ব্যবসায়ীরা দেশে ডলার সংকটের কারণে আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলতে পারছেন না। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ইমপোর্টর ক্ষেত্রে এসেন্সিয়াল কমোডিটিস আন্তর্জাতিক রেট বিবেচনা সাপেক্ষে এলসি খোলা বহাল আছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের দাম অনিয়ন্ত্রিত থাকায় এলসি খোলা যাচ্ছে না। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে গত মাসের চেয়ে এ মাসে এলসি খোলার হার ৩১.১৬ শতাংশ কমে গেছে। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে দেশের রপ্তানি কমেছে ৬.২৪% ও রেমিট্যান্স কমেছে ২৫% ভাগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, আমদানিকারকরা সেপ্টেম্বরে ৫.৭০ বিলিয়ন ডলারের এলসি খুলেছেন, যা গত বছরের একই মাসে ছিল ৮.২৮ বিলিয়ন ডলার। কারখানার যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মতো সব ধরনের আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়।

আরও পড়ুন: জানুয়ারিতে জ্বালানি তেলের দাম কমল

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদায়ী অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে থাকে। ২০২১-২২ অর্থবছরের শেষ নাগাদ রিজার্ভ ৪১.৮২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগেরবারের থেকে কমেছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির হার নিম্নমুখী। আমদানিকারকরা জুনে ৮.৪৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খুলেছিলেন, যা সেপ্টেম্বরে ৫.৭০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। জুন মাসে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ৭.৭৫ বিলিয়ন ডলার। টানা তিন মাসের পতনের প্রবণতা সেপ্টেম্বরেও অব্যাহত ছিল। এ মাসে এলসি সেটেলমেন্ট ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও, এলসি নিষ্পত্তি আগস্টের তুলনায় ১.৩১ বিলিয়ন বা ১৮% কমেছে।

আরও পড়ুন: দেশের রিজার্ভ ছাড়াল ৩৩ বিলিয়ন ডলার

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাপান, চীন, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে উন্নত মানের গাড়ি ও পোশাক এনে ঋণপত্র খুলতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন আমদানিকারকরা। দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রতি ডলারের মূল্য ১০৬ টাকা। যদিও এ দামে কোনো ব্যাংকেই ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকগুলো বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ডলারপ্রতি ১১০-১১২ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। আর মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করছে তারও বেশি। আর মানি চেঞ্জারগুলো প্রতি ডলারের দাম নিচ্ছে ১১৪-১১৫ টাকা। ডলারের দাম অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এলসি কোনো এলসিই খুলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে ডলার নেই। এজন্য এলসি খোলা কঠিন হয়ে গেছে। চাপাচাপি করলে ব্যাংকাররা যে দর বলছেন, সে দরেই ডলার কিনতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে ১১০ টাকা দরেও ডলার কিনতে হয়েছে।

এদিকে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ব্যাংকাররা স্বীকারও করছেন। তারা বলছেন, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ১১৪ টাকা দরেও রেমিটেন্স কিনতে হচ্ছে। ব্যাংক তো গ্রাহকদের কাছে লোকসানে বিক্রি করবে না। ব্যাংকের স্বার্থে বড় ব্যবসায়ীদের কেনা দামেও ডলার দিতে হচ্ছে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের একই দামে ডলার দেয়া সম্ভব নয়। ফলে এ শ্রেণির ব্যবসায়ীদের থেকে বাড়তি দাম নিতে হচ্ছে। দেশের অন্তত তিনটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকরা এসব কথা বলেছেন। তবে তাদের কেউই নিজেদের নাম উদ্ধৃত করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যখন আমদানির ওপর শর্ত আরোপ করে তখন আমদানি নিয়ন্ত্রণ জরুরি ছিল। কারণ অনেক অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশ অনেকাংশে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই শিল্প যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে কোনো কাজ হবে না। আমাদের বড় আমদানি অব্যাহত রাখতে হবে।

তিনি বলেন, আমদানির মূল্য বাড়লেও আয়তন বাড়েনি। বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও গভীরভাবে দেখা উচিত যে, পণ্যগুলো ঠিকভাবে আসছে কি না। এখন মেশিন আনা হচ্ছে, নাকি মেশিন আমদানির নামে ওভার ইনভয়েসিং করে টাকা পাচার করা হচ্ছে।

এদিকে দেশের রফতানি খাতে বড় প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ফলে অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই সরকারের চলতি হিসাবে ঘাটতি তৈরি হয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলার। দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতিও ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। রেমিট্যান্সের মন্দা ভাবের পাশাপাশি আমদানি প্রবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতির সঙ্গে নতুন দুশ্চিন্তাও যুক্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতিতে। প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থের পণ্য রফতানি হচ্ছে, সেটি প্রত্যাবাসিত হচ্ছে না। শুধু গত আড়াই বছরেই রফতানি ও অর্থ প্রাপ্তির ব্যবধান ১ হাজার ২৯১ কোটি বা ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। করোনার প্রভাবে বিদেশী ক্রেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশী রফতানিকারকদের বাণিজ্য বিরোধের ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে রফতানির বিপরীতে পণ্যের মূল্য হ্রাসের ঘটনাও। ঋণপত্রের বিপরীতে অর্থ পরিশোধের সময়সীমা বেড়ে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাবও রফতানি আয় প্রত্যাবাসনের ওপর পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রফতানি আয়ের যে প্রবৃদ্ধি সেটি আমদানি ব্যয়ের তুলনায় খুবই কম। এ কারণে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে। করোনাভাইরাস সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগ, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা কারণে জ্বালানি তেল-গ্যাসসহ খাদ্যপণ্যের দাম এখন আকাশচুম্বী। শিগগিরই এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে এমন কোনো অবস্থাও দেখা যাচ্ছে না। ফলে সরকারের চলতি হিসাব ও ব্যালান্স অব পেমেন্টের বিদ্যমান ঘটতি বছর শেষে আরো বড় হবে। আগামী দুই বছর একই পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকলে দেশের অর্থনীতিতে দুর্যোগ নেমে আসবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আবুল কালাম আজাদ এ প্রতিবেদককে বলেন, ইমপোর্টর ক্ষেত্রে এসেন্সিয়াল কমোডিটিস আন্তর্জাতিক রেট বিবেচনা সাপেক্ষে এলসি খোলা বহাল আছে। তবে ডলার রেটের তারতম্যের কারণে পরিমাণটা অনেক কমেছে।