তেলের প্রভাবে জীবনযাত্রার পদে পদে হিসাব নিকাশ

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৫:২৭ অপরাহ্ন, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৫:২৭ অপরাহ্ন, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের  হাতাহাতি ঝগড়া
  • বাস ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার
  • এবার লঞ্চের ভাড়া ৭.৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে
  • অগ্নিমূল্যে দিশেহারা সাধারণ মানুষ, চাল সবজিসহ নিত্যপণ্যের বাজারে উত্তাপ
  • ঢাকায় কিছু বাসে বেশি ভাড়ার অভিযোগ, চার্ট না থাকায় ভোগান্তি ও ঝগড়া
  • ট্রেনের ভাড়া নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি: নৌপরিবহন মন্ত্রী

সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। নগরজুড়ে বাসভাড়া বাড়ানো হলেও তা নিয়ে যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বাসে নতুন ভাড়ার চার্ট বা তালিকা না থাকায় যেমন যাত্রীরা সঠিক ভাড়া নিয়ে অন্ধকারে আছেন, তেমনি নির্ধারিত ভাড়া চাওয়া নিয়ে চালক-সহকারীদের সঙ্গে যাত্রীদের প্রতিনিয়ত ঝগড়া হচ্ছে। আবার কোনো কোনো বাসে পাঁচ থেকে ১০ টাকা ভাড়া বেশি নেওয়ারও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। শুধু তাই নয়, অগ্নিমূল্যে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ, চাল-ডাল ও সবজিসহ নিত্যপণ্যের বাজারে দেখা দিয়েছে উত্তাপ। গতকাল বুধবার সরেজমিনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী,সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, শাহবাগ-ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার ও নীলক্ষেত-ধানমন্ডি ও শ্যমলী,মিরপুর-মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক গণপরিবহনে চালক, সহকারী ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে নানা অব্যবস্থাপনা এবং মানুষের কষ্টের দৃশ্য। গতকাল বুধবার সকালে  সায়েন্সল্যাব থেকে সাভার পরিবহণের একটি বাসে রায়সাহেব বাজারে পৌঁছান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, আগে ২০ টাকা ভাড়া দিলেও আজকে ২৫ টাকা চাওয়া হয়েছে। এ নিয়ে বাসের স্টাফদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা-কাটাকাটিও হয়। তিনি বলেন, যে যে ভাবে পারছে, ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেখার যেন কেউ নেই।

আরও পড়ুন: দেশের বাজারে বাড়ল সোনার দাম

যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে রাজধানীতে কিলোমিটারপ্রতি বাসভাড়া ১৭ পয়সা বাড়ায় সরকার। কিন্তু নতুন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শুরু থেকেই দেখা দিয়েছে নানা অসঙ্গতি। সরেজমিনে অধিকাংশ বাসেই সরকার নির্ধারিত নতুন ভাড়ার চার্ট টানাতে দেখা যায়নি। পরিবহনকর্মীদের অভিযোগ, ভাড়ার চার্ট না থাকায় যাত্রীরা নতুন নির্ধারিত ভাড়া মেনে নিতে চান না। ফার্মগেট এলাকায় এক বাসের সহকারী জানান, সরকার নির্ধারিত বাড়তি ভাড়া চাইলে যাত্রীরা উল্টো তর্ক শুরু করেন। চার্ট না থাকায় তারা নির্ধারিত ভাড়া প্রমাণও করতে পারছেন না, ফলে প্রতিনিয়ত যাত্রীদের সঙ্গে ঝগড়া, এমনকি হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ যাত্রীরা। কারওয়ান বাজার এলাকায় বেশ কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেন, নতুন ভাড়ার সুযোগ নিয়ে অনেক বাসে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত পাঁচ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করা হচ্ছে। চার্ট না থাকার সুযোগে ওয়েলকাম, প্রজাপতি বা বিকল্পের মতো রুটের বাসগুলোতে যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে ভিন্ন চিত্রও মিলেছে কিছু বাসে। কোনো কোনো যাত্রী জানান, চার্ট না থাকায় কিংবা গণ্ডগোল এড়াতে কিছু কিছু বাসে এখনো আগের ভাড়াই নিচ্ছেন সহকারীরা। যাত্রীরা বলছেন, নতুন ভাড়া কার্যকরের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিটি বাসে দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার চার্ট টানানো বাধ্যতামূলক করা উচিত ছিলো। তাদের অভিযাগ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ নজরদারির অভাবেই প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।

বাস ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি: জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। নতুন নির্ধারিত ভাড়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৭০ পয়সা এবং আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনটি গতকাল বুধবার প্রকাশ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলার অভ্যন্তরীণ রুটের বাস-মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। নতুন ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। গ্যাসচালিত বাস ও মিনিবাসে এই ভাড়ার হার কার্যকর হবে না। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য বিআরটিএর অনুমোদিত আসন সংখ্যা কমিয়ে কোনো বাস বা মিনিবাসের আসন পুনর্বিন্যাস করা হলে নির্ধারিত ভাড়া আনুপাতিক হারে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রুট পারমিট অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ বা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির কাছ থেকে আনুপাতিক ভাড়ার হার অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি বাস ও মিনিবাসের দৃশ্যমান স্থানে নতুন ভাড়ার তালিকা বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বিআরটিএর পক্ষ থেকে সিটি সার্ভিসে কিলোমিটারপ্রতি ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে তিন শ্রেণির ক্ষেত্রেই কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। নতুন ভাড়া নির্ধারণের মধ্য দিয়ে ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া সংক্রান্ত আগের সব প্রজ্ঞাপন ও আদেশ রহিত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: দেশের বাজারে আবারও বাড়ল সোনার দাম

এবার লঞ্চের ভাড়া ৭.৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে: জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির পর এবার লঞ্চ ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। লঞ্চের ভাড়া ৭.৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে যাত্রীদের জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ টাকা। প্রথম ১০০ কিলোমিটারের প্রতি কিলোমিটারে ২৩ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২০ পয়সা। লঞ্চে ভাড়া ৭.৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এবার যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানান মালিকরা। তারা একজন যাত্রীর যাতায়াতে প্রতি কিলোমিটারে ৫১ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর জন্য নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে তারা প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য বিদ্যমান দুই টাকা ৯৫ পয়সার স্থলে চার টাকা ৪৫ পয়সা এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার দুই টাকা ৫২ পয়সার স্থলে চার টাকা দুই পয়সা করার কথা বলেছে। অন্যথায় জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে নৌমন্ত্রী জানিয়েছেন, লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। লঞ্চ মালিকদের দাবি মানা হলে ঢাকা থেকে বরিশাল পর্যন্ত ডেক শ্রেণির ভাড়া ৪২৯ থেকে বেড়ে ৬৬০ টাকা হবে। কেবিন শ্রেণির যাত্রীর ভাড়া হবে ডেকের চারগুণ।

ট্রেনের ভাড়া নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি: দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বাসভাড়ার পর এবার বাড়ানো হয়েছে লঞ্চের ভাড়া। তবে ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হবে কিনা, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে ব্রিফিংকালে এক প্রশ্নের জবাবে এমনটা জানান তিনি। নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, রেল মন্ত্রণালয় থেকে রেলের ভাড়া বাড়ানোর চাপ আছে, নাহলে লোকসান আরও বাড়বে। আমরা ১০ বছর রেলের ভাড়া বাড়াইনি। জনগণের প্রতি আমাদের মনোযোগ, দায়বদ্ধতা আছে। তিনি বলেন, এবার ভাড়া বাড়ানোর খুব চাপ আছে। কারণ, নাহলে আরও লোকসান হবে। তবুও এখনও রেলের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেইনি। বলেছি ভাড়া না বাড়িয়ে যা আছে তা যাতে রাখা যায়। ফলে আপাতত আগের ভাড়া থাকছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি রেলের ভাড়া না বাড়ানোর। একান্তই যদি ভাড়া বাড়ে, সেটি যৌক্তিক বাড়বে। তবে এখন পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেইনি। লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ব্যবস্থাপনার ব্যয় বৃদ্ধিসহ সবকিছু বিবেচনায় নৌযান মালিকরা ১৫ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিলেন। তবে যাত্রীদের কথা বিবেচনায় রেখে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সর্বনিম্ন ভাড়া আগে ৩২ টাকা ছিল। বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভাড়া বৃদ্ধি কাম্য না। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় ছিল না। এজন্য জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করেই আমরা সর্বনিম্ন ভাড়া বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। ভাড়া বৃদ্ধির নামে নৈরাজ্য কিংবা তেলের দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কাউকে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ দেইনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিএনজির দাম বাড়েনি। কাজেই সিএনজিচালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কারও বাড়তি ভাড়া নেয়ার তথ্য পাওয়া গেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।