কমপ্লিট শাটডাউনে অচল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধে চরম অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীরা

Sanchoy Biswas
বরিশাল ব্যুরো
প্রকাশিত: ৯:০৮ অপরাহ্ন, ১২ মে ২০২৬ | আপডেট: ১০:০৮ অপরাহ্ন, ১২ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো ক্যাম্পাস। পদোন্নতি-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের জটিলতার প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষকরা উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার পর টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ রয়েছে ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। শিক্ষকদের সর্বাত্মক কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা, আর এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনগুলোতে ছিল নিস্তব্ধতা। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকলেও কোনো বিভাগে ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন দপ্তরে তালা ঝুলে থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কার্যত কর্মহীন সময় পার করেন। আন্দোলনরত শিক্ষকরা সোমবার বিভিন্ন দপ্তর থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দিয়ে কক্ষে তালা লাগিয়ে দেন। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: ঢাবির সহকারী প্রক্টর শেহরীন মোনামির পদত্যাগ

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, প্রায় ৬০ জন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন করছেন। তাদের অভিযোগ, ছয় মাস আগে পদোন্নতি বোর্ড গঠন করা হলেও একাধিক সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন উপাচার্য। এমনকি সাম্প্রতিক জরুরি সিন্ডিকেট সভাতেও সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং অধিকাংশ সদস্যের মতামত উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা।

ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ধীমান কুমার রায় বলেন, “আমরা উপাচার্যকে প্রশাসনিকভাবে কোনো সহযোগিতা করব না। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বাধ্য হয়েই আমরা আন্দোলনে নেমেছি।” তিনি জানান, বর্তমানে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলেও পরবর্তীতে সেশনজট পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

আরও পড়ুন: উপাচার্যকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা, পূর্ণাঙ্গ শাটডাউনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা বহু শিক্ষক পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। ইতোমধ্যে প্রক্টরসহ কয়েকজন দায়িত্ব ছাড়ার কথা জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল কাইউম বলেন, “সিন্ডিকেটের অন্তত নয়জন শিক্ষক প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আরও অনেকে পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।”

প্রক্টরের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক রাহাত হোসাইন বলেন, “শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নতির বিষয়ে উপাচার্যের দীর্ঘসূত্রতায় তার সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়। তাই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।”

অন্যদিকে প্রশাসনিক দপ্তরে তালা থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বিপাকে পড়েছেন। অর্থ দপ্তরের প্রধান সুব্রত কুমার বাহাদুর বলেন, “শিক্ষকদের অনুরোধে আমরা কক্ষ ছেড়েছি। উপাচার্যের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়েই অবস্থান করব।”

আন্দোলনরত শিক্ষকরা জানান, গত ৩০ এপ্রিল পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে উপাচার্য, বিভাগীয় কমিশনার ও শিক্ষকদের প্রতিনিধিদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছিল। সেখানে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। সেই আশ্বাসের পর শিক্ষকরা পাঁচ দিনের জন্য আন্দোলন স্থগিত রেখে কেবল পাঠদান চালু করেন। তবে পরে সংকট সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ফের কঠোর কর্মসূচিতে ফিরে যান তারা।

এদিকে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলম আন্দোলনের কিছু অংশকে আইনবিরোধী আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করতে পারেন, কিন্তু অন্যের কাজে বাধা দিতে পারেন না। প্রশাসনিক দপ্তরে তালা দেওয়া সরাসরি আইনবিরোধী।” তিনি আরও দাবি করেন, সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষকদের প্রতিনিধিসহ সবার মতামতের ভিত্তিতে আগামী দুই মাসের মধ্যে অভিন্ন সংবিধি প্রণয়ন করে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উপাচার্য বলেন, “আমরা বিধি অনুযায়ী পদোন্নতি দিতে আন্তরিক। এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত পদত্যাগপত্র পাইনি, তবে কয়েকজন মৌখিকভাবে দায়িত্ব ছাড়ার কথা জানিয়েছেন।”

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে ২০১৫ সালের বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ২০২১ সালের অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণের পরামর্শ দেয়। দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই নীতিমালা কার্যকর হলেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এ কারণে নতুন সংবিধি অনুমোদনের পর পদোন্নতি কার্যকর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন।

গত ২১ এপ্রিল শুরু হওয়া আন্দোলন ধাপে ধাপে কর্মবিরতি, শাটডাউন ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচিতে রূপ নেয়। চলমান এই অচলাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশাসনিক সেবা এবং শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।