ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ

ভোট কারচুপির অভিযোগে অন্তত ৩৬ প্রার্থীর নির্বাচনী আবেদন

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৯:২১ অপরাহ্ন, ১২ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৯:২১ অপরাহ্ন, ১২ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে ভোট কারচুপি, অনিয়ম ও ফলাফল বিকৃতির অভিযোগে অন্তত ৩৬ জন প্রার্থী হাইকোর্ট বিভাগে নির্বাচনী আবেদন (ইলেকশন পিটিশন) দায়ের করেছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুযায়ী দায়ের করা এসব আবেদনের শুনানি চলছে বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে। ইতোমধ্যে আদালত বেশ কয়েকটি আসনের ব্যালট পেপার, রেজাল্ট শিট ও নির্বাচন-সংক্রান্ত সরঞ্জাম সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন, যা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নতুন আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অন্য দিকে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট সাবেক দুই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে অভিযোগ তুলেছেন পুরো নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করে একটি দলকে জয়ী করা হয়েছে।  

আরও পড়ুন: ৯ এপ্রিল বগুড়া–৬ ও শেরপুর–৩ আসনের ভোট, প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালট সুবিধা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন আসনে ভোট কারচুপির অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে। পরাজিত প্রার্থীদের একটি অংশ অভিযোগ করেন— ভোটগ্রহণ, গণনা ও ফল ঘোষণার বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম হয়েছে এবং প্রকৃত ফলাফল প্রতিফলিত হয়নি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন জমা পড়তে থাকে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ৩৬ জন প্রার্থী হাইকোর্টে নির্বাচনী আবেদন করেছেন।

আরও পড়ুন: প্রবাসীদের এনআইডি কার্যক্রমে অগ্রগতি: প্রস্তুত ১৮,৮৬৫ পরিচয়পত্র

এর মধ্যে রয়েছে—

বিএনপির ১৪ জন প্রার্থী,

১১ দলীয় জোটের ৮ জন প্রার্থী,

একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী,

এবং সর্বশেষ আরও ৬ জন প্রার্থী পৃথকভাবে আবেদন করেছেন।

সাম্প্রতিক আবেদনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন খেলাফত মজলিসের আমির ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হক, যিনি ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছেন। একই অভিযোগে বিএনপির আরও চারজন প্রার্থী পৃথক নির্বাচনী আবেদন করেছেন।

মামলাকারী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—

মাওলানা মামুনুল হক (১১ দলীয় জোট),

ফারুক আলম সরকার (গাইবান্ধা-৫, বিএনপি),

নবী উল্লাহ নবী (ঢাকা-৫, বিএনপি),

হাসান জাফির তুহিন (পাবনা-৩, বিএনপি),

সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী (কুষ্টিয়া-৪, বিএনপি)।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও খুলনা-৫ আসনের নির্বাচনী ফল চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। এ আসনে বিজয়ী ঘোষিত হন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আসগর।

ঢাকা-১৩ আসনের ফলাফল নিয়েও আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। এ আসনে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে মামুনুল হক ফল চ্যালেঞ্জ করেছেন। ওই আসনে বিজয়ী ঘোষিত হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ।

আদালতের নির্দেশ

নির্বাচনী আবেদনগুলোর প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট আসনগুলোর ব্যালট পেপার, রেজাল্ট শিটসহ প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সরঞ্জাম আদালতের হেফাজতে সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এই সংরক্ষণ নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আইনি ভিত্তি

গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (Representation of the People Order – RPO) এর ৪৯ ধারায় নির্বাচনের ফলাফল বা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে হাইকোর্ট বিভাগে নির্বাচনী আবেদন করার বিধান রয়েছে। এই ধারার আওতায় গঠিত নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারে— যার মধ্যে ফলাফল বাতিল, পুনর্গণনা বা পুনঃনির্বাচনের নির্দেশও থাকতে পারে।

অতীতের নজির

এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভোট কারচুপির অভিযোগে মোট ৭৪ জন পরাজিত প্রার্থী হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে চারজন গণফোরামের, একজন পিডিপির এবং বাকি অধিকাংশই বিএনপির প্রার্থী ছিলেন।

আইনি বিশ্লেষণ: 

আইনজ্ঞরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর তুলনামূলকভাবে দ্রুত সময়ে এত সংখ্যক নির্বাচনী আবেদন জমা পড়া দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঘিরে বিচারিক পর্যালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। আদালত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট আসনের ফলাফল বহাল রাখা, পুনর্গণনা কিংবা নির্বাচন বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।