নির্বাচনের আগেই নির্ধারিত ফল: সংরক্ষিত নারী আসনে ‘সংখ্যার গণতন্ত্র’, প্রতিদ্বন্দ্বিতা শূন্যে

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৬:৩৫ অপরাহ্ন, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৬:৩৫ অপরাহ্ন, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা চোখে পড়লেও বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দিচ্ছে—এটি কার্যত এক পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। শত শত মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের পরও জমা পড়েছে মাত্র তিনটি, আর দলীয় হিসাব-নিকাশই নির্ধারণ করে দিচ্ছে কারা যাচ্ছেন সংসদে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি আদৌ নির্বাচন, নাকি কেবল দলীয় ভারসাম্য রক্ষার সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৎপরতা বাড়লেও পরিসংখ্যান ও প্রক্রিয়াগত বাস্তবতা বলছে এই নির্বাচন কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ও পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের দিকে এগোচ্ছে।

আরও পড়ুন: এনআইডি ডিজি হুমায়ুন কবীরের বদলি: জনপ্রশাসনে প্রত্যাবর্তন

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত মোট ৪৩১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ৪১৭টি, জামায়াতে ইসলামী নিয়েছে ১৩টি, আর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নিয়েছে ১টি। তবে বিস্ময়করভাবে, এখন পর্যন্ত জমা পড়েছে মাত্র তিনটি মনোনয়নপত্র—যারা সবাই বিএনপির প্রার্থী: সানজিদা ইসলাম তুলি, নিলুফার ইয়াসমিন মনি ও আশরাফুন নাহার।

ইসির সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন জানিয়েছেন, মনোনয়ন জমার শেষ সময় ২১ এপ্রিল। হাতে সময় থাকলেও জমা দেওয়ার এই চিত্রই ইঙ্গিত দিচ্ছে—বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

আরও পড়ুন: বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ নির্বাচনে প্রবাসী ভোটে ভাটা: পাঠানো হাজারো ব্যালট, ফেরত মাত্র ৪টি

সংখ্যাই বলে দিচ্ছে ফলাফল: 

ইসি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সংরক্ষিত নারী আসনের এই নির্বাচন মূলত সাধারণ আসনের ফলাফলের গাণিতিক সম্প্রসারণ। যে দল যতটি সাধারণ আসনে জয়ী হয়েছে, সংরক্ষিত আসনও পায় সে অনুপাতে। ফলে প্রতিটি দল সাধারণত ঠিক ততজন প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেয়, যতটি আসন তারা পাবে।

এই হিসাব অনুযায়ী—বিএনপি পেতে যাচ্ছে ৩৬টি সংরক্ষিত নারী আসন, জামায়াত-এনসিপি জোটের জন্য নির্ধারিত ১৩টি আসন,ছয়জন স্বতন্ত্র এমপির জোট পাবে ১টি আসন।  অর্থাৎ, জামায়াত-এনসিপির ১৩টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের মধ্যেই তাদের সম্ভাব্য এমপিদের তালিকা কার্যত নির্ধারিত হয়ে গেছে। একইভাবে বিএনপির বিপুল সংখ্যক ফরম সংগ্রহের পরও শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রার্থীই মনোনয়ন পাবে।

বিএনপির বাছাই শেষ প্রান্তে: 

সংরক্ষিত নারী আসনের বড় অংশ পাওয়ার সম্ভাবনায় থাকা বিএনপি ইতোমধ্যে তাদের বাছাই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার শেষে এখন চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন চলছে।

দলীয় সূত্র জানায়, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও মাঠপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্ধারণ করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই মনোনয়ন জমা দেবে দলটি।

অন্যদিকে, সাধারণ আসনে জয়ী ছয়জন স্বতন্ত্র এমপি এখনো সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেননি। তাদের জন্য বরাদ্দ একটি আসন থাকলেও এই নীরবতা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও একপেশে করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মনোনয়নপ্রত্যাশী কয়েকজন নারী নেত্রী তাদের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। শেরপুর-২ থেকে থেংসি তিসা সাংমা বলেন, দলীয় সাক্ষাৎকারে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়ার আশা করছেন।

জামালপুর-৪ থেকে সাদিয়া হক বলেন, সাক্ষাৎকারে সন্তোষজনক পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন, এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে—এই প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তের ভেতরেই সীমাবদ্ধ।

তফসিল থাকলেও ‘শেষ’ নির্ধারিত আগেই ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী—মনোনয়ন জমার শেষ সময় ২১ এপ্রিল, যাচাই-বাছাই ২২-২৩ এপ্রিল, আপিল ২৭-২৮ এপ্রিল, প্রত্যাহার ২৯ এপ্রিল, প্রতীক বরাদ্দ ৩০ এপ্রিল এবং ভোটগ্রহণ ১২ মে।

তবে রাজনৈতিক মহলে ধারণা—মনোনয়ন জমার শেষ সময়েই কার্যত এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যাবে। কারণ, প্রতিটি দল তাদের প্রাপ্ত আসনের সমান সংখ্যক প্রার্থীই দিচ্ছে।

নির্বাচন না হয়েও নির্ধারিত ফল: 

বাংলাদেশে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য এখনো সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী, সাধারণ আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে এসব আসন বণ্টন করা হয় এবং ভোট দেন কেবল নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।

এই কাঠামোর কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবে একটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়—মনোনয়ন সংগ্রহ ও জমাদানের চিত্রই স্পষ্ট করে দিচ্ছে, নির্বাচন শুরুর আগেই ফল নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে।

গণতন্ত্রের প্রশ্নে ঘুরেফিরে একই বিতর্ক: 

সংরক্ষিত নারী আসনের এই নির্বাচন আবারও সামনে আনছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—এটি কি নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ, নাকি কেবল দলীয় ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা?

সংখ্যার রাজনীতি ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের এই কাঠামোয় নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হলেও, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গণতন্ত্রের চর্চা কতটা হচ্ছে—তা নিয়েই এখন নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।