নির্বাচনী দায়িত্বে প্রাণহানি হলে ১০ লাখ টাকা অনুদান, ইসির নতুন সুরক্ষা নীতিমালা
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে ঝুঁকির মুখে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রথমবারের মতো একটি বিস্তৃত আর্থিক সহায়তা কাঠামো চালু করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন নীতিমালার আওতায় নির্বাচনী দায়িত্বে দুর্বৃত্তের হামলা, দুর্ঘটনা, গুরুতর অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তার পরিবার সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন অনুদান পাবেন। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট জনবলকে সুরক্ষা ও প্রণোদনা দেওয়ার লক্ষ্যে গৃহীত এই উদ্যোগ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে কার্যকর হবে।
নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীল জনবলকে আর্থিক সুরক্ষার আওতায় আনতে নতুন নীতিমালা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান তুলে ধরা হয়েছে।
আরও পড়ুন: স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি এগোচ্ছে, কমিশন সভার অপেক্ষায় ইসি
‘নির্বাচনে ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন সংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থ, গুরুতর অসুস্থ, আহত, গুরুতর আহত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মৃত ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা/অনুদান প্রদান নীতিমালা-২০২৬’ শীর্ষক এই নীতিমালার মাধ্যমে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে সৃষ্ট বিভিন্ন ঝুঁকির আর্থিক প্রভাব মোকাবিলায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু হলো।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও এই সুবিধার আওতায় আসবেন। একই সঙ্গে ভোটার তালিকা প্রণয়ন কার্যক্রমে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা পাবেন।
আরও পড়ুন: নির্বাচনী ব্যয়ে জমা না দেওয়ায় ২১ জন এমপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়াচ্ছে ইসি
মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা:
নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে দুর্বৃত্তের হামলা বা দুর্ঘটনায় কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য নিহত হলে তাঁর পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এককালীন অনুদান দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া একই কারণে কেউ স্থায়ীভাবে অক্ষম বা গুরুতর আহত হলে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা এবং সাময়িকভাবে অক্ষম বা গুরুতর আহত হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। সাধারণ ধরনের আঘাত বা শারীরিক ক্ষতির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া যাবে।
নির্বাচন কমিশনের মতে, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা প্রায়ই দুর্গম এলাকা, সংঘাতপ্রবণ পরিবেশ কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় এই আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
আকস্মিক অসুস্থতা ও চিকিৎসা ব্যয়েও সহায়তা
শুধু হামলা বা দুর্ঘটনা নয়, দায়িত্ব পালনকালে আকস্মিক অসুস্থতা বা চিকিৎসাজনিত জটিলতার ক্ষেত্রেও সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে নতুন নীতিমালায়।
এর আওতায় দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান পাবে।
আকস্মিক গুরুতর অসুস্থতা বা স্থায়ী অক্ষমতার জন্য সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা, সাময়িক অসুস্থতার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সাধারণ চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নির্বাচনী জনবলের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা:
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নির্বাচন পরিচালনা একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেক সময় জীবন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
অতীতে নির্বাচনী সহিংসতা, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা আকস্মিক অসুস্থতায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কোনো সুসংগঠিত আর্থিক সহায়তা কাঠামো না থাকায় নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতো। নতুন নীতিমালা সেই শূন্যতা পূরণে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উত্তরাধিকারীদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা:
অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে কারা উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হবেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের পেনশন সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধান অনুসরণ করে উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা হবে। মৃত ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকলে অনুদানের অর্থ সমানভাবে বণ্টিত হবে এবং তাঁদের যৌথভাবে আবেদন করতে হবে।
তবে পুনর্বিবাহের পর স্বামী বা স্ত্রী এই সুবিধা পাবেন না বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মৃত ব্যক্তির কোনো স্বামী বা স্ত্রী জীবিত না থাকলে অনূর্ধ্ব ২৫ বছর বয়সী ছেলে বা অবিবাহিত মেয়ে আবেদন করতে পারবেন। সন্তান না থাকলে বাবা-মা আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
এ ছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে অবিবাহিত ভাই-বোন কিংবা বিবাহিত মেয়েরাও প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপন করে অনুদানের দাবিদার হতে পারবেন।
আবেদন করতে হবে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে:
আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা মৃত্যুর ঘটনার সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বা অফিস প্রধানের মাধ্যমে আবেদন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিব বরাবর পাঠাতে হবে।
আবেদনের সঙ্গে নির্ধারিত ফরম, সত্যায়িত ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, উত্তরাধিকার সনদ এবং সরকারি হাসপাতাল বা সিভিল সার্জনের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে।
আবেদন যাচাইয়ে বিশেষ কমিটি:
অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পাঁচ সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই ও সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-১ উইংয়ের যুগ্মসচিব কমিটির সভাপতি এবং বাজেট ও অর্থ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
কমিটি প্রতি অর্থবছরে অন্তত দুইবার আবেদনগুলো পর্যালোচনা করবে এবং যাচাই শেষে অনুদানের পরিমাণ নির্ধারণ করে সচিবের কাছে সুপারিশ পাঠাবে। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে সরাসরি অর্থ প্রদান করা হবে।





