৬ নবজাতকের নির্মম মৃত্যু: আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন
রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের নির্মম মৃত্যু নিয়ে প্রাথমিক তদন্তে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় নানা রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। আবাসিক এলাকায় সরকারি বিধি-বিধান পুরোপুরি না মেনে গড়ে ওঠা হাসপাতালটির রিপোর্ট করতে গিয়ে কর্মচারী-সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরাও। রমনা থানায় মামলা, সরকারি তদন্ত কমিটি এবং প্রতিদিনই হাসপাতালটির অবৈধ স্থাপনার তথ্য উদঘাটিত হলেও এখন পর্যন্ত শিশু মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত কাউকে আটক না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
দেশের বড় একটি শিল্প পরিবারের মালিকানাধীন এই হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে মা ও শিশু চিকিৎসার নামে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। হাসপাতালটির মালিক মহিউদ্দিন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ সমিতিরও সভাপতি। এখান থেকেই পরিচালিত হয় চিকিৎসাখাতের বিশেষ গোষ্ঠীর কার্যক্রম।
আরও পড়ুন: দেশে হাম উপসর্গে ২ শিশুর মৃত্যু, মোট ৫৮৫ জনের মৃত্যু
সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ আইসিইউ ইউনিটে কর্তৃপক্ষের নিদারুণ অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরের চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে ঘনবসতিপূর্ণ সরু রাস্তার আবাসিক এলাকার চারটি বহুতল ভবনকে একত্রিত করে মেডিকেল কলেজ এবং একই সঙ্গে মা ও শিশু চিকিৎসার এত বড় হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়া হলো। এই হাসপাতালটির কারণে আশপাশ এলাকায় আবাসিক পরিবেশসহ জনজীবনে তীব্র ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের পরিদর্শনে হাসপাতালটির ছাদে একটি বেকারি ফ্যাক্টরিরও সন্ধান মিলেছে। সরু রাস্তার গলিবেষ্টিত এই ভবনটিতে কীভাবে উন্নত চিকিৎসার নামে এত কিছুর সরকারি অনুমোদন দেওয়া হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কাদের তদবিরে বা কী স্বার্থে দেশের বৃহৎ হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের অনুমোদন এত ছোট ভবনে দেওয়া হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে চিকিৎসাসেবার মান নিয়েও।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে হাসপাতালটি যথাযথ সরকারি বিধি মোতাবেক স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তবে কাউকে আটক করা হয়নি।
গত বুধবার সকালে হাসপাতালটির ডেলিভারির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা এক থেকে তিন দিন বয়সী ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। কী কারণে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত চলছে।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছেন রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশিক ইকবাল। তদন্তকারী কর্মকর্তা আশিক বলেন, নবজাতকদের মৃত্যুর পর থেকেই হাসপাতালটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তবে কাউকে এখনো আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। নবজাতকদের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আশিক ইকবাল বলেন, সিআইডির নেওয়া নমুনার প্রতিবেদন ও সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।
আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাণ হারানো এক শিশুর বাবা হাবিবুর রহমান গত বুধবার রাতে রাজধানীর রমনা থানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এ ঘটনা ঘটেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার দিন দুপুরের দিকে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের ওই কক্ষ সিলগালা করে দেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিটের সদস্যরা। পরে সেখান থেকে আলামত সংগ্রহ করেন তাঁরা। এছাড়াও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-এর বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরাও সেখানে আসেন। কক্ষটিতে ক্ষতিকর কোনো গ্যাস আছে কি না, সেটির নমুনা সংগ্রহ করে দলটি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হান বলেন, হাসপাতালের ওই কক্ষ ‘সাফোকেটিভ (বদ্ধ)’ ছিল। এটিকে পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত হয়নি।
জাহিদ রায়হান আরও বলেন, “এ রকম একটা জায়গায় ছয়টি মৃত্যু খুব অস্বাভাবিক। ওই রকম একটা পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড বছরের পর বছর ধরে চলছে, কোনো দুর্ঘটনা হয়নি। এখন হঠাৎ ছয়টি শিশু কেন মারা গেল? সুতরাং কারণটা খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।”
ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মি. ইসলাম জানান, ২৫ মে তার কন্যা শিশুর জন্ম হয়, নাম রেখেছিলেন জান্নাতি।
হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকা শিশু ও তার মায়ের সঙ্গে ছিলেন মি. ইসলামের মা। তিনি জানান, “আমার নাতনি কালকে সন্ধ্যারাতেও ভালো ছিল। রাত তিনটায় হঠাৎ করেই দেখি আমার নাতনি কাঁদছে। আর থামে না।”
তবে মৃত শিশুদের স্বজনদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, এই সংখ্যা আরও বেশি।
এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসায় অবহেলাসহ নানা অভিযোগ তুলছেন ভুক্তভোগীরা।
যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অসুস্থ হয়ে পড়লে গভীর রাতে একটি শিশুকে হাসপাতালের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোনো জটিলতা না পাওয়ায় আবারও তাকে পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে ফেরত পাঠান চিকিৎসক।
“ভোররাতে ওই ওয়ার্ডে থাকা ছয় শিশুই একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা দিয়েও তাদের আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি,” বলেন আদ-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, যে ওয়ার্ডে শিশুদের রাখা হয়েছিল সেখানে এসি বন্ধ করতে বলেছিলেন একজন মা। তবে সেই রুমটিতে বাতাস আসা-যাওয়ার বিকল্প আর কোনো পথ ছিল না বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
তিনি বলেন, সেখানে “শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি পাওয়া গেছে।”
ঘটনা নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাটি বুধবার সকালে আলোচনায় আসে।
জানা গেছে, হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১১ জন মা, যাদের ছয়জনের সঙ্গে ছিল ছয়টি নবজাতক শিশু।
মৃত শিশুদের স্বজনদের অনেকেই বলছেন, গভীর রাত থেকেই ওই ওয়ার্ডে থাকা শিশুরা অসুস্থ হতে শুরু করে। একপর্যায়ে ভোরের দিকে শিশুগুলো বমি করতে শুরু করলে চিকিৎসার তোড়জোড় শুরু হয়।
ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন একাধিক রোগীর স্বজন জানান, রাত তিনটার দিকে শুরুতে দুই শিশু বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে আবারও তাদের ওয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়।
কিন্তু ভোরের দিকে ওই ওয়ার্ডে থাকা ছয় শিশু একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের সবাইকে আবারও এনআইসিইউতে নেওয়া শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (NICU) হলো যেখানে সদ্যজাত অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।
মারা যাওয়া এক শিশুর অভিভাবক জানান, “রাতে হঠাৎ করেই দেখি আমার বাচ্চা কান্না শুরু করছে। ভোরের দিকে ওয়ার্ডের চার-পাঁচটা বাচ্চা একসঙ্গে সমানে বমি করছিল।”
হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডে থাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র থেকে গ্যাস লিকেজের কারণেই শিশুগুলোর মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন অনেক ভুক্তভোগী।
মারা যাওয়া এক শিশুর অভিভাবক বলেন, “পুরো ওয়ার্ডেই গ্যাসের বিকট গন্ধ ছিল। একসঙ্গে সবগুলো বাচ্চা কান্না শুরু করে।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যা বলছে
ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনাকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবেই বর্ণনা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
তাদের দাবি, গভীর রাতে হঠাৎ দুই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ভোর নাগাদ ছয়জন শিশুকেই এনআইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল।
আদ-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, হাসপাতালে যে ওয়ার্ডে এই শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ১১ জন মা ও ছয়জন শিশু ভর্তি ছিলেন। নবজাতকদের বয়স এক অথবা দুই দিন বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, রাতে ওই ওয়ার্ডের এসি বন্ধ থাকায় শ্বাস নিতে সমস্যা হয়েছিল শিশুদের।
“রাতে এসি বন্ধ করতে বলেছিলেন একজন মা, হঠাৎ করে রাত তিনটার পরে দুইটি শিশু অসুস্থ হওয়ায় তাদেরকে এনআইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল,” তিনি বলেন।
চিকিৎসকরা রাতেই অসুস্থ শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, শিশুদের অবস্থা ভালো থাকায় তাদের আবারও ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
“ভোরের দিকে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লে ছয়জন শিশুকে আবারও এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পথেই দুই শিশুর মৃত্যু হয় এবং বাকি চারজনকে আইসিইউ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই চার শিশুকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি,” বলেন তিনি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, চিকিৎসকরা সব ধরনের চেষ্টা করার পরও শিশুগুলোকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালের মহাপরিচালক বলেন, “এত দ্রুত ঘটনাটি ঘটেছে, আমরা ঠিকমতো দেখারও সুযোগ পাইনি। চিকিৎসকরা এনআইসিইউতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বাচ্চাদের এতই শ্বাসকষ্ট ছিল যে তাদের বাঁচানো যায়নি।”
এছাড়া ওই ওয়ার্ডে আরও পাঁচটি নবজাতক ভর্তি ছিল বলে যে তথ্য রয়েছে, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, জন্মগত জটিলতার কারণে তারা আগে থেকেই এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল এবং বর্তমানে তারা ভালো আছে।
তদন্ত ও কমিটি গঠন
এক হাসপাতালে প্রায় একই সময়ে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর এই ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তৈরি করেছে।
সকালেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। সেখানে “শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি” পাওয়া গেছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
তিনি বলেন, ভোরবেলায় ওই কক্ষে এসি-সংক্রান্ত জটিলতা অথবা অন্য কোনো কারণে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্তে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা অবহেলা এবং অবকাঠামোগত কোনো ত্রুটি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে কারিগরি বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা হবে।
তদন্ত কমিটি এখনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়নি, কারণ তারা প্রত্যক্ষদর্শী ও অভিভাবকদের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন করতে পারেনি।





