রাতভর ঝড়-বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগে গাজার মানুষ

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ন, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১:০২ অপরাহ্ন, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গাজার বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো শীতের প্রথম বড় ঝড়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। লাগাতার রাতভর বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়ে গেছে হাজারো মানুষের আশ্রয়স্থল। টেনে–টেনে বেঁচে থাকা মানুষের জীবন এখন আরও বিপর্যস্ত।

দেইর আল-বালাহর একটি জীর্ণ তাঁবুতে স্ত্রী নূর ও পাঁচ সন্তানসহ বসবাস করেন আরাফাত আল-গানদুর। মাত্র আট বর্গমিটারের ওই টেন্টে তার বাবা-মা, বোনের পরিবার, ভাইয়ের স্ত্রী–সন্তান মিলিয়ে মোট ১৫ জন মানুষ গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

আরও পড়ুন: কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি ‘হাতের নাগালে’: আরাঘচি

সারা রাত ছিদ্র বন্ধ করতে কাপড়–পলিথিন ব্যবহার করেছি। ঘুমাইনি এক মুহূর্তও, আল জাজিরাকে বলেন ৩৯ বছর বয়সী আরাফাত। “এই ঝড় তো নাকি এখনো পুরোপুরি শুরুই হয়নি।”

ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবার ভিজে যাওয়া কাপড়, কম্বল, আর সামান্য কিছু ব্যবহারের জিনিসপত্র শুকাতে বাইরে ছড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি

তার স্ত্রী নূর বলেন, “শিশুরা ঘুমাচ্ছিল, কিন্তু সমস্ত কাপড় ভিজে গিয়েছিল। একে একে সবাইকে উঠিয়েছি—আর ভিজলে তো ঠান্ডা লেগে অসুস্থ হয়ে যেত।”

নূরের অভিযোগ, বারবার আর্তনাদ জানালেও কারও সাড়া আসে না।

“এটা কি জীবন? আমাদের মত অবস্থায় কে থাকতে পারবে? মিডিয়া আসে, ছবি তোলে, আমরা কাঁদি—তারপর কিছুই বদলায় না।”

এক বছর ছয় মাস ধরে তাঁবুর জীবন

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে দেড় বছর আগে ঘরবাড়ি হারিয়ে দক্ষিণে চলে আসে পরিবারটি। কাজ নেই, আয় নেই—ফলে নতুন আশ্রয়েরও ব্যবস্থা করতে পারেনি তারা।

আরাফাত বলেন, “পরিবার নিয়ে এমন অবস্থায় ঘুমানো—এটা কোনো সম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ মেনে নিতে পারে না। কিন্তু আমাদের কোনো বিকল্প নেই। মর্যাদা সব দিক থেকে পিষ্ট হয়ে গেছে।”

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কারাভান, হাউজিং ইউনিট—এসবের কথা আমরা শুধু শুনি। বাস্তবে কিছুই দেখি না। আমাদের কষ্ট কি কেউ দেখে?”

একটি ভালো মানের তাঁবুর দাম ১,৮০০–২,৫০০ শেকেল (৫৫০–৭৭৫ ডলার)। টারপলিন ও নাইলনের দাম ২৫০–৪০০ শেকেল।

“আমার মতো বেকার মানুষ এসব কিনবে কীভাবে?” প্রশ্ন আরাফাতের।

টেক্কিয়া খাবার দিলে খাই, না দিলে না—এটাই এখন জীবন

পরিবারটির কোনো আয় নেই, খাদ্য, পানি, পোশাক বা কম্বল কিছুই কেনার সামর্থ্য নেই।

শিশুদের খাওয়াতেই পারছি না, বলেন তিনি। “যদি রান্নাঘর থেকে খাবার আসে, তাহলে খাবো; নইলে না।

ঝড়ের সতর্কতা শুনে তিনি আরও আতঙ্কিত। আমার শুধু একটা ভালো তাঁবু দরকার—যাতে শিশুদের রক্ষা করতে পারি।

আমাদের জীবনের বেদনা বোঝে কে?

৬৬ বছর বয়সী বসমা আল-শেখ খলিল নিজের বৃষ্টিভেজা তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে নিকাশি পানিতে ভেসে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে বলেন,

“আমার বয়সে বিশ্রাম আর উষ্ণতা দরকার ছিল। কিন্তু দুই বছর ধরে শুধু দুর্ভোগই সহ্য করছি।

তার নাতি–নাতনিদের কাঁপতে থাকা দেখে তিনি বলেন, ওরা রাতভর কাঁপেছে। যুদ্ধের এই কষ্ট ওদের ছোট বয়সটাই কেড়ে নিয়েছে।”

গতরাতে তাদের টেন্টে পানি অর্ধেক পায়ের উচ্চতা পর্যন্ত ওঠে। বন্যার সঙ্গে মিশে যায় স্থানীয় সেসপুলের নোংরা পানি—পুরো এলাকা দুর্গন্ধে ভরে ওঠে।

এই গর্তটাই আমরা দুই বছর ধরে টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করছি, বসমা বলেন। এটা কি কোনো মানুষের জীবন?

বোমাবর্ষণে গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয় তার ছয় ছেলের পরিবারসহ পুরো পরিবার। কয়েকবার উত্তরে ফিরলেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় আবার দক্ষিণে ফিরে আসে।

গাজাজুড়ে অবস্থা একই—ধ্বংস, ক্ষুধা, ক্লান্তি, দুর্দশা… চারদিকে কেবল কষ্টই কষ্ট।

তিনি বলেন, গরমে কষ্ট, শীতে আরও যন্ত্রণাদায়ক—প্রতিটি ঋতুই এখন আমাদের কাছে শাস্তি।

সূত্র: আল-জাজিরা