সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করবে যুক্তরাষ্ট্র
সৌদি আরবের কাছে সর্বোচ্চ ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির পরিকল্পনা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর দেশটির কংগ্রেসকে অবহিত করেছে। প্রস্তাবিত এই অস্ত্রচুক্তির সম্ভাব্য মূল্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে সৌদি আরবকে এফ-৩৫ বিক্রির পরিকল্পনায় আপত্তি জানিয়েছে ইসরায়েল।
চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের মতো কোনো আরব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহারের সুযোগ পাবে। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, এই বিক্রির মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নন-ন্যাটো মিত্রের নিরাপত্তা জোরদার হবে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে দাবি করেছে দপ্তরটি।
আরও পড়ুন: ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে তীব্র সংঘাত, ২৪ ঘণ্টায় নিহত ৬৩
মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, কয়েক মাস ধরে সৌদি আরবের এফ-৩৫ কেনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও আরব বিশ্বের একাধিক সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, চুক্তি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল।
এর আগে নভেম্বর মাসে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের আওতায় সৌদি আরবের এফ-৩৫ কেনার বিষয়টি দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের হোয়াইট হাউস সফরের সময় ওই প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব চূড়ান্ত হয়।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে টানা তিন দিন কমল তেলের দাম
পরে ডিসেম্বর মাসে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ (কিউএমই) বা সামরিক সক্ষমতায় ইসরায়েলের বিশেষ সুবিধা বজায় থাকবে কি না, তা পর্যালোচনা করছে। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও কংগ্রেসে চুক্তিটি নিয়ে কয়েক দফা গোপন বৈঠক করেন।
মিডল ইস্ট আইকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালেদ বিন সালমান চলতি গ্রীষ্মে একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। চুক্তিটি বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করাও তার সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে কর্মকর্তারা জানান।
সৌদির নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেই ঘোষণা
কয়েক মাস ধরে চুক্তির আলোচনা চললেও ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন সৌদি আরব আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন চাপের মুখে রয়েছে।
হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে রয়েছে সৌদি আরব। একই সময়ে ইয়েমেনে সৌদি আরবের মিত্র হিসেবে পরিচিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির আরব উপসাগরীয় অংশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির ঘোষণা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রির বিরোধিতা করে আসছেন।
ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
আরব দেশগুলোর তুলনায় ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতায় বিশেষ সুবিধা বজায় রাখার নীতি বহু পুরোনো। শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই এ ধারণার বিকাশ ঘটে। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও মিসরের মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়। তখন মিসর ছিল আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি।
২০০৮ সালে মার্কিন কংগ্রেস আইন করে ইসরায়েলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ নীতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করা হয়।
এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সক্ষমতাও বিভিন্ন সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত প্যাকেজের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়। রাডার ও স্টেলথ প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোতে ভিন্নতা রেখে ক্রেতার প্রয়োজন অনুযায়ী যুদ্ধবিমান সরবরাহ করা সম্ভব।
ইসরায়েল এফ-৩৫ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু প্রযুক্তিগত সুবিধা পেয়েছে। মিডল ইস্ট আইয়ের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘপাল্লার হামলা পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে ইসরায়েল নিজস্বভাবে বিমানটির জ্বালানি ধারণক্ষমতাও পরিবর্তন করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরব যে এফ-৩৫ পাবে, তাতে ইসরায়েলের ব্যবহৃত সব ধরনের বিশেষ সুবিধা থাকবে না। তবে সৌদি সংস্করণে ঠিক কী কী পরিবর্তন রাখা হবে, তা অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হতে পারে।
চীনের কাছে প্রযুক্তি যাওয়ার আশঙ্কা
সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মহলের কিছু সদস্যের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, সৌদি আরব এই যুদ্ধবিমান পরিচালনা করলে চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষণার এক দিন আগে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে একই ধরনের উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়।
এখন প্রস্তাবিত চুক্তির পরবর্তী ধাপ এবং সৌদি আরবকে কী ধরনের প্রযুক্তিগত কনফিগারেশনের এফ-৩৫ দেওয়া হবে, সেটিই আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।





