বেরিয়ে আসছে নানা অপকর্ম, মন্ত্রী হতে চেয়েছিল

সেই পিয়ন ওসিকে ডাকতো তুই বলে আর ওসি বলতো স্যার

Abid Rayhan Jaki
মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব
প্রকাশিত: ৮:১৫ অপরাহ্ন, ১৬ জুলাই ২০২৪ | আপডেট: ৯:০৫ পূর্বাহ্ন, ১৭ জুলাই ২০২৪
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পিয়নের চাকরি করে ৪০০ কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া জাহাঙ্গীর আলমের নানা অপকর্ম বেরিয়ে আসছে। গত বছর ডিসেম্বরে থাকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে নিষিদ্ধ করার প্রজ্ঞাপন দেওয়ার পরেও তার বিরুদ্ধে সরকারিভাবে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি বহিষ্কার করা হয়নি নোয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি পদ থেকে। গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজেই তার এখানে চাকরি করা এক পিওনের ৪00 কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরার পর থেকেই আলোচনায় আসে জাহাঙ্গীর আলমের নাম।  একসময় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের আগতদের পানি খাওয়াতো পিয়ন পানি জাহাঙ্গীর। বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গণভবনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে সে। এই প্রভাবকে বিস্তার করে দুহাতে কামায় টাকা আর জমি। শত কোটি টাকার মালিক হয়েও থেমে থাকেনি সে, সাধ হয়েছে এমপি মন্ত্রী হওয়ার। তাই নোয়াখালীর চাটখিল এলাকার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতো সে। থানা  আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে প্রশাসনের সকলেই তাকে মান্য করত।  বরখাস্ত হওয়ার আগে চাঁদখিল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের অফিসের সাথে এক টেলিফোন কথোপকথনে  উঠে আসে তার প্রভাব বিস্তারের নমুনা।  আরেকটি টেলিফোন আলাপে দেখা যায় সেই পিয়ন জাহাঙ্গীর সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার একজন প্রধানের নাম ভাঙ্গিয়ে আরেক কর্মকর্তাকে হুমকি দিচ্ছেন শায়েস্তা করার। নিম্নে পিয়ন জাহাঙ্গীর এর সাথে ওসির ফোনালাপটি দেওয়া হল।।

ওসি: স্লামালিকুম স্যার; 

আরও পড়ুন: দোহাটেক নিউমিডিয়া স্বচ্ছতা ও সাফল্যের সঙ্গে ই-জিপি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে

জাহাঙ্গীর: ওসি সাব তোমারে কিন্তু ভুতে পায় আমি বলি দিছি, কুত্তার বাচ্চা; চো.. পুত, তোমারে ভুতে পায়, আমার লোক ঢাকায় ‍তুমি মামলা নিলা কেন? শুয়রের বাচ্চা। 

ওসি : কে নিছে? কোন মামলা নিছে স্যার..

আরও পড়ুন: সীমান্তবর্তী ও দুর্গম অঞ্চলে রেললাইন সম্প্রসারণে জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে: ডেপুটি স্পিকার

জাহাঙ্গীর: তুমি ১৫ দিনের মধ্যে ৬টা মামলা নিছো, আমি জামিন করাইতে হোগা হাডি যায় তুমি আবার রবিবার মামলা নিছ। 

ওসি: না স্যার রবিবার কোন মামলা নেইনি। 

জাহাঙ্গীর: সে ঢাকাতে তুমি ১৫ দিনে ৬টা মামলা নিলা কেন? 

ওসি: এগুলো আগের মামলা, সে ঢাকাতে থাকা অবস্থায় কোন মামলা নেইনি। এগুলো আগের মামলা।

জাহাঙ্গীর: কিসের আগের মামলা, তুমি একটার পর একটা মামলা নিতেছ? আমি তাকে নিয়া ঈদের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যামু, তারপর তোর বারোটা বাজায়ালামু, কুত্তার বাচ্চা, শুয়রের বাচ্চা।

ওসি: স্যার আপনি ল্যাংগুয়েজ সুন্দর করে বলেন। স্যার, আপনি শিক্ষিত মানুষ। 

জাহাঙ্গীর:কুত্তার বাচ্চা কিসের ল্যাংগুয়েজ। তুই বাড়াবাড়ি করোস।

ওসি: স্যার আমি কোন বাড়াবাড়ি করি না। আপনি ল্যাঙ্গুয়েজ সুন্দর করে বলেন, আপনার এখানে (চাটখিল থানায়) চাকরি না করলেও আমি ভাত খেতে পারবো বুঝছেন। 

জাহাঙ্গীর: তুমি অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করতেছো, তুমি দলের লোকের বিরুদ্ধে মামলা নিতাছো শুয়েরর বাচ্চা। 

ওসি: এই ল্যাঙ্গুয়েজ আপনি ব্যবহার করতে পারেন না। আমি আনাকে এটাই বললাম স্যার। আমি এখানে চাকরি করবো না (উত্তেজিত কন্ঠ) আপনি আমাকে কুত্তার বাচ্চা বলছেন। 

জাহাঙ্গীর: (উত্তেজিত হয়ে) তুই বেটা বিএনপির সন্ত্রাসী লোক…

ওসি: আপনি আমাকে কুত্তার বাচ্চা বলছেন, আমি এখানে চাকরি করবো না আমি দেখে নিব।

জাহাঙ্গীর: তুই বেটা বিএনপির লোক

ওসি: আমি দুই বার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনছি এখানে, আমি দুইবার নির্বাচন করে দিছি। 

জাহাঙ্গীর: আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনছত? 

ওসি: হ্যাঁ আমি দুইবার দুইবার এখানে নির্বাচন করছি।  

জাহাঙ্গীর দলের লোকের বিরুদ্ধে মামলা নেস। ইয়াবা পানি খাস

ওসি: আমি কোন ইয়াবা ব্যবসায়ীকে প্রশ্রয় দেই না। ইয়াবার সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা আছে এমন কোন  কথা কেউ বলতে পারবে না। 

জাহাঙ্গীর: তুই বেটা ইয়াবা বাণিজ্য করোস। 

ওসি: আমার কাছে রেকর্ড আছে আমি কোন ইয়াবা পার্টিরে ছাড়ি না। 

জাহাঙ্গীর: ডিআই-১ আমাকে নিজে জানাইছে তুমি একটা মেয়েকে নির্যাতন করছো। সদরের, আমাকে ডিআই-১ নিজে বলছে। সেই মেয়েকে রেফ করছে। আমাকে ডিআই-১ নিজে বলছে। 

ওসি: ও বললে হবে না, আমার এসপি আছে। তদন্ত হবে, এসব মিথ্যা কথা। 

জাহাঙ্গীর: ডিআই আমাকে নিজে বলছে, আমরা পারতেছি না, আপনারা ব্যবস্থা নেন। সে একটা মেয়েকে নির্যাতন করছে। 

ওসি: ওটা তাদের ব্যাপার; এখানে পুলিশের কোন ব্যাপার নাই। 

জাহাঙ্গীর: ডিআইজি আমাদের ফ্যামেলির লোক। সেও আমাকে বলছে। 

ওসি: ১০ জন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান আমার পক্ষে কথা বলেছে। 

জাহাঙ্গীর: তোমার পক্ষে বলছে ১০ জন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান? তারা আমার পক্ষেও বলেছে। তুমি বিএনপির পক্ষে। তুমি মেয়র মানিকের কাছ থেকে টাকা নিয়া মেয়র মানিকের পক্ষে সমস্ত রিপোর্ট দিছো। 

ওসি: আমার ওপর অপবাদ দিচ্ছেন। কে মেয়র মানিকের কাছ থেকে টাকা নিছে প্রমাণ দেন..

এই ফোন আলাপ প্রধানমন্ত্রীর পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম ও চাটখিল থানার ওসি আব্দুস সামাদের মধ্যাকার। জাহাঙ্গীরের অপর একটি টেলিফোন আলাপও আমাদের হাতে এসেছে। তাতে তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানের নাম ভাঙ্গিয়ে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে থ্রেট দেন।

ফোন ধরতেই .. ওই কর্মকর্তা হ্যালো .. আমি জাহাঙ্গীর বলছি.. স্লামালেকুম ভাই। (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি কর্মকর্তা) আমার সঙ্গে ফাইজলামি শুরু করছো। আমি ডিজিএফআইর আকবর ভাইরে দিয়া সোজা ধরে নিয়ে আসবো। আমি একবার সোজা নিয়া ডিজিএফআইর আকবর ভাইয়ের কাছে ডুকাই দিমু। ইয়ার পরে আপনাকো আপনাগো যতো বাপ আছে না কোন বাপ আপনাগরে ছাড়াইতে পারবো না। আপনার ভাই কতবড় লাটসাবের বাইচ্চা হই গেছে সে আমার ফোন কাটি দিতে আছে। আমারতো লাটসাবকে দেখা দরকার। কথার জবাব দিচ্ছেন না কেন?

অপর পক্ষ এসব কথা কেন হইতেছে আমতো জানি না। . . . ইত্যাদি ইত্যাদি। 

প্রধানমন্ত্রীর সেই আলোচিত পিয়ন জাহাঙ্গীর ওরেফে পানি জাহাঙ্গীর এভাবেই থানার ওসি, পুলিশ সুপার (এসপি) ও জেলাপ্রশাসকদের ওপর ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন। তার এরকম বেশ কিছু ফোনের অডিও রেকর্ড প্রতিদিনের বাংলাদেশের হাতে এসেছে। 

সরকারপ্রধানের এমন স্পষ্ট বক্তব্যের পরই নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওই পিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তৎপর হয়েছে।  স্থগিত করা হয়েছে তার ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক লেনদেন। বহুল আলোচিত সেই পিয়নের নাম জাহাঙ্গীর আলম। সাধারণ মানুষের কাছে তার পরিচিতি ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল থানার খিলপাড়া ইউনিয়নে নাহারখিল গ্রামে। জাহাঙ্গীর আলম নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয় দিতেন। এ পরিচয় দিয়ে এলাকায় চাকরি-বাণিজ্য, কমিশন-বাণিজ্য, প্রাইভেট স্কুল দখল, জমি দখল, ইটভাটা দখল, টেন্ডারসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত করেন। বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হুমকি দিয়ে অনিয়ম করে বেশ কয়েকজনকে ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করান। জাহাঙ্গীর আলম তার ভাগনে শিপনের মাধ্যমে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন বলে অভিযোগ আছে। তিনি ওসি, এসপি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মী অনেকের যে কারও সঙ্গে রুঢ় আচরণ করতেন। তার কথা না শুনলে অশ্রাব্য অশ্লীল গালিগালাজ করতেন। এভাবে নিজের কাজ বাগিয়ে নিতেন জাহাঙ্গীর। 

প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয় ব্যবহার করে জাহাঙ্গীর তদবীর, অবৈধ দখল বাণিজ্য, কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, জাহাঙ্গীর তার অর্জিত সম্পদের সামান্য অংশই দেশে বিনিয়োগ করেছেন। অধিকাংশ অর্থ পাচার করেছেন দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। 

জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানায়, দুবাইর গোল্ড মার্কেটে জাহাঙ্গীরের বিনিয়োগ শতকোটি টাকার বেশি। দুবাই থেকে তিনি সোনার বার নিয়ে আসতেন। সেখান তার জুয়েলারি ব্যবসাও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এপিএস ও বিভিন্ন গোয়েন্দা এবং আইন প্রয়োগকারি সংস্থা প্রধানের নাম ভাঙ্গিয়ে তিনি বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ বের করে নিতেন। কেউ তার লাগেজ বা ব্যাগে হাত দেওয়ারও সাহস পেতো না। 

জাহাঙ্গীরের জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদ অনুসন্ধানে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। প্রধানমন্ত্রী তার বিষয়ে কথা বলার পরপরই তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন বলে তার ভাই দাবী করেছেন। 

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে,  পিয়ন থেকে জাহাঙ্গীর হতে চেয়েছেন এমপি-মন্ত্রী। বাগিয়ে নেন তার নিজ এলাকা নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ। স্ত্রী-শাশুড়িসহ নামে বেনামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। ঢাকার মিরপুরে রয়েছে বহুতল ভবন, ধানমন্ডিতে আলিশান ফ্ল্যাট। চট্টগ্রাম কর্ণফুলী টানেলের পাশে ১০০ বিঘা জমি, নোয়াখালীর চাটখিল ও মাইজদিতে রয়েছে বহুতল ভবন ও বিঘার পর বিঘা জমি। ব্যাংকে ডিপোজিট তার কয়েক শ কোটি টাকা। নিজ এলাকায় তিনি যখন যেতেন তার গাড়ির সামনে পেছনে থাকত পুলিশের বিশেষ স্কর্ট। সেখানে তার নির্দেশেই চলত পুলিশ ও প্রশাসন। থানার ওসি,  উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের সব রদবদল হতো তার ইশারায়। স্থানীয় এমপি থাকলেও এমপি থাকলেও পানি জাহাঙ্গীরের কথাই সেখানে ছিল শেষ কথা।

স্থানীয়রা জানান, পানি জাহাঙ্গীরের বাবা ইউনিয়ন পরিষদের কেরানির চাকরি করতেন। সংসারে ছিল টানাপোড়েন। দল ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর এ পিয়নের উত্থান অনেকের কাছে আলাদিনের চেরাগের মতো। চাটখিলে পৈতৃক ভিটায় করেছেন চার তলা বাড়ি। সামনে বিশাল গেইট। বাড়ির পাশে রয়েছে ৭০০ শতক জমি। উপজেলার খিলপাড়া পূর্ব বাজারে রয়েছে প্রায় কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ। জেলা শহরের মাইজদীতে রয়েছে আট তলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল ভবন।