সিকদার পরিবারের আর্থিক উত্থান-পতন ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি
এক সময় বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে প্রভাবশালী নাম ছিল সিকদার পরিবার ও তাদের সিকদার গ্রুপ। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসিসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বৃদ্ধি পায় বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে গ্রুপটির আর্থিক অবস্থান, মালিকানা কাঠামো ও কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণ, অনিয়ম ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা ও তদন্তের খবরও সামনে আসে।
আরও পড়ুন: রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান
গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল হক সিকদার ২০২১ সালে দুবাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরবর্তীতে পারিবারিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে এবং স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার দায়িত্ব পালন করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রন হক সিকদারের মৃত্যুর খবর বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে পরিবার বা গ্রুপের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি। একই পরিবারের আরেক সদস্য রিক হক সিকদারও বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি, উদ্বেগের কিছু নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী
বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সূত্র এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ববর্তী তথ্য অনুযায়ী, সিকদার গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ ছিল, যার একটি বড় অংশ বর্তমানে খেলাপি অবস্থায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
বিদ্যুৎ, রিয়েল এস্টেট, স্বাস্থ্যসেবা ও নির্মাণ খাতসহ একাধিক খাতে তাদের প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনাদায়ী সুদ যুক্ত হয়ে মোট দায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসিসহ একাধিক ব্যাংক সিকদার গ্রুপের বড় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। ন্যাশনাল ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি এবং ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা হয়েছে।
ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার এবং আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ব্যাংকটি বর্তমানে তারল্য সহায়তার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৪ সালে রন হক সিকদার ও রিক হক সিকদারের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ অপব্যবহার ও বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগে মামলা করে।
মামলার নথিতে বিভিন্ন দেশে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা ও অর্থ স্থানান্তরের তথ্য উল্লেখ করা হয়, যা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU)-এর অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে এসব অভিযোগ বিচারাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত নয়।
বর্তমানে সিকদার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য বিদেশে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। গ্রুপটির অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ হয়ে গেছে। আর্থিক দায়, আইনি জটিলতা ও ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে এক সময়ের প্রভাবশালী এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এখন সংকটপূর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।





