প্রধানমন্ত্রীর সফরে মামলা প্রত্যাহারে আলোচনায় থাকছে

মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বন্ধের মূলে বিতর্কিত মানব পাচার মামলা

Any Akter
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন, ২১ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৩:৩৩ অপরাহ্ন, ২১ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার খুলতে অপ্রমাণিত মামলা প্রত্যাহারের শর্ত দিয়েছে মালয়েশিয়া। ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠিয়ে মানব পাচার, চাঁদাবাজি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এনে ১০৩ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করেন জনশক্তি রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান আফিয়া ওভারসিজের মালিক আলতাব খান। ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর করা ওই মামলার বাদী নিজেই ‘কাউন্টার সেটিংয়ের’ মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগে ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার ক্লাং উপত্যকায় অভিযান চালিয়ে আলতাব খানকে গ্রেপ্তার করে দেশটির মালয়েশিয়ান অ্যান্টিকরাপশন কমিশন (এমএসিসি)। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ—তিনি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশটির বিমানবন্দরে কর্মরত কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের নির্বিঘ্নে ইমিগ্রেশন পার করার ব্যবস্থা করতেন। ওই মামলাটি দেশটির দুর্নীতি দমন আইন ২০০৯-এর ১৬(এ)(বি) ধারায় তদন্ত হয়। পরে আলতাব খান ভিসা বাতিল ও মালয়েশিয়া না যাওয়ার শর্তে জামিন পান।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বন্ধের নেপথ্যে রয়েছে আলতাব খানের ভয়ানক ষড়যন্ত্র। তিনি মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছিলেন না। তার নামে শ্রমিক পাঠানোর কোনো অ্যালোকেশন (বরাদ্দ) ছিল না। তার নামে কোনো অ্যাপ্রুভাল (অনুমোদন) ছিল না, তার নামে কোনো সত্যায়ন কপি এমনকি দূতাবাসে সত্যায়ন কপিও ছিল না। শ্রমিক নিয়োগের কোনো অনুমতি তার ছিল না। তার প্রতিষ্ঠানের নামে ছিল না কোনো বহির্গমন অনুমতি এবং তিনি কোনো শুল্কও দেননি। মালয়েশিয়াতে শ্রমিক পাঠানোর কোনো বৈধ অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে শ্রমিক পাঠালেন এবং মামলা করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। অথচ তার বিপরীতে তিনি যাদেরকে আসামি করেছেন, তারা সবাই প্রকৃতপক্ষে দু’দেশের সব নিয়মনীতি অনুসরণ করে শ্রমিক পাঠিয়েছেন, শুল্ক দিয়েছেন এবং সকল ছাড়পত্র নিয়েছেন। এরপরও সাধারণ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানি করা হচ্ছে। এছাড়াও আলতাব খান ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন, যার ফলে দলের সুনামও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

আরও পড়ুন: কুয়ালালামপুর এর পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, আলতাব খান আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। তাকে কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ধরছে না। দেশ ও দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলার পরও সবাই আলতাবকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। একজন ব্যক্তির প্রতিহিংসার কারণে পুরো শ্রমবাজার মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ে আছে। তিনি পুরো জনশক্তি রপ্তানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যাচ্ছেন, যার ফলে পুরো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে জনশক্তি রপ্তানির যে অফুরন্ত সুযোগ দিয়েছিল, তা বন্ধ করে রেখেছেন আলতাব খান ও তার সহযোগীরা। তার মিথ্যা মামলায় ভিক্টিম হয়ে বহু ব্যবসায়ী এখনো আতঙ্কে আছেন। তার অপতৎপরতা ও সাজানো অভিযোগে করা মিথ্যা মামলার কারণে পুরো দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে তার অপপ্রচারে বিভ্রান্ত (মিসগাইডেড) হয়ে তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, দ্রুত এই পরিস্থিতির অবসান হওয়া উচিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, আলতাব খান যেসব নথি দিয়ে মামলা করেছেন, অর্থাৎ তিনি যে ডিমান্ড লেটার ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেখিয়েছেন, তা ছিল জাল। ফলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটির তদন্ত শেষে ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) দিয়েছে। আলতাব খান সিআইডির প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করেন। আদালত নারাজি আমলে নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) মামলার তদন্ত করার নির্দেশ দেন। ডিবি পুলিশ সম্প্রতি ৫২ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। ফলে মালয়েশিয়ায় নতুন করে শ্রমিক প্রেরণ প্রক্রিয়া শুরু করা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

আরও পড়ুন: আজ মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আলতাব খানের মামলার পর একই অভিযোগে ধারাবাহিকভাবে মামলা করে দুদক ও সিআইডি। মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে কয়েক দফায় অনুরোধ করেছে, যাতে দুই দেশের মধ্যে শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ পর্যালোচনা করে তা প্রত্যাহার করা হয়। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য—মালয়েশিয়ায় মানব পাচার সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনের (টিআইপি রিপোর্ট) রেটিং উন্নত করা। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আজমান মোহাম্মদ ইউসুফ গত বছরের ২৩ এপ্রিল এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘মানব পাচার ও অর্থ পাচারের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ভিত্তিহীন এবং তা মালয়েশিয়ার সুনাম ক্ষুণ্ন করছে।’ ওই সময় বাংলাদেশ সরকার দফায় দফায় অপ্রমাণিত অভিযোগের মামলাগুলো প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। বরং নতুন নতুন মামলা হয়েছে। ফলে মালয়েশিয়া পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে—এসব প্রত্যাহার না হলে তারা বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবে না। এখনো ব্যবসায়ীরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে এই মামলাগুলোকেই প্রধান কারণ বলে মনে করছেন।

জানা গেছে, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ সীমিত সংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়। বিগত ধাপে ‘জিটুজি প্লাস’ চুক্তির আওতায় ১০১টি এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক নেওয়া হয়। যারা ওই সময় সরাসরি শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ পায়নি, তারা এই ১০১ এজেন্সিকে ‘সিন্ডিকেট’ নাম দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে নানামুখী প্রচার শুরু করে। ব্যবসায়ীদের এই অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে। এই বিরোধ দেশের শ্রমবাজারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন 'বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির' (বায়রা) সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘২০২৪ সালের ১ জুন থেকে মালয়েশিয়ার বাজারটি বন্ধ হওয়ার পর আমরা আর তা খুলতে পারিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যখন দেশে পুলিশি ব্যবস্থা ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, তখন আলতাফ হোসেন (আলতাব খান) নামে একজন ব্যবসায়ী অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে মামলা করেন। সিআইডি মামলাটির তদন্ত করে এটি মিথ্যা বলে রিপোর্ট দেয়। তবে দুদক ও সিআইডিও আলাদা কিছু মামলা করেছে। গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন আসার পর মালয়েশিয়া সরকারের নির্দেশে ওই দেশের অ্যান্টি-করাপশন কমিশন বিষয়টি দীর্ঘ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয় যে, সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড পদ্ধতিতে স্বচ্ছতার সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়া হয়েছে এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলো অসত্য। এরপরই মালয়েশিয়া সরকার দফায় দফায় বাংলাদেশকে অপ্রমাণিত মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে চিঠি দেয়। বাংলাদেশ সরকার থেকেও চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে এসব মামলার সত্যতা নেই, এগুলো প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অন্তর্বর্তী সরকার মামলাগুলো প্রত্যাহার করেনি। যার ফলে বাজারটিও খুলছে না। এখন সরকারের উচিত দ্রুত মামলাগুলো নিষ্পত্তি করে শ্রমবাজার খোলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।’