দিনে দিনে ইলিশ আরও ছোট হচ্ছে উৎপাদনও কমছে, নেপথ্যে কী

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১০:০৭ অপরাহ্ন, ২২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১০:০৭ অপরাহ্ন, ২২ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে প্রায় দুই দশক একনাগাড়ে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির পর হুট করেই গত তিন বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন ক্রমাগত কমার পাশাপাশি মাছটি আরও ছোট হয়েছে। শুধু তাই নয়, একাধারে উৎপাদন কমছে, গড় ওজনও কমতে শুরু করেছে। তবে মাছটির দাম ঠিকই বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সূত্রে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি ধরা হচ্ছে ছোট আকারের ইলিশ। গত জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ধরা পড়া ইলিশের গড় আকার দাঁড়িয়েছে ৩৪ সেন্টিমিটার বা সাড়ে ১৩ ইঞ্চির কাছাকাছি। ইলিশের এই গড় আকার গত বছরের তুলনায় এক ইঞ্চির মতো কম।

আরও পড়ুন: ভয়াবহ ভূমিকম্পে কাঁপলো ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, ঢাকার বাজারভেদে এখন ৪০০ থেকে ৯০০ গ্রাম আকারের ইলিশের প্রতি কেজির দাম দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত, যা গত বছরের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। ২০২০ সালে ইলিশের সারা বছরের গড় দাম ছিল প্রতি কেজি ৭০১ টাকা।

যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গবেষকদের মধ্যে। ফলে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গত ছয় বছর মেয়াদি যে প্রকল্প ২০২০ সালে নিয়েছিল মৎস্য অধিদপ্তর, সেখানে কার্যত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তবে চলতি জুনে ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষের আগেই নতুন প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে সরকারি পর্যায়ে।

আরও পড়ুন: ৬ জেলায় সেনা মোতায়েন নিয়ে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অথচ ২০১৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মাছটির পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচনের কৃতিত্ব অর্জনের পর আশা করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশে ইলিশের সংরক্ষণ, উৎপাদন ও গুণগত মানের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি অর্জিত হবে। কিন্তু এর বদলে মাছটির উৎপাদন ও ওজন দুটিই কমছে।

এ নিয়ে গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ নিজেই অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, ইলিশের উৎপাদন ও ওজন দুটোই কমছে।

তিনি এও বলেছেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে এবং বিভিন্ন দেশ ইলিশ আমদানিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ইলিশ রপ্তানির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

তবে সাগরে অতিরিক্ত মাছ ধরার (ওভার ফিশিং) বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাগরের মৎস্যসম্পদের তুলনায় আমাদের জেলের সংখ্যা অনেক বেশি। সমুদ্র ও নদীতে অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং জাটকা নিধন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সময় দরিদ্র জেলেদের জীবনধারণের সংকটের বিষয়টিও সরকার বিবেচনায় নিচ্ছে।

উৎপাদন কমতে শুরু করার বিষয়টি মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহও স্বীকার করেছেন। তিনি বলছেন, ২০২১ সাল পর্যন্ত দুই দশকে যেভাবে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছিল, নানা কারণে সেটি ধরে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ইলিশ গবেষক ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. আনিসুর রহমান বলছেন, বড় ইলিশ আসতে শুরু করেছিল। সেখানে কেন হুট করে উৎপাদন ও ওজন কমতে শুরু করল, সেটি চিহ্নিত করা জরুরি। বাজারে ছোট ইলিশ বাড়ছে, বড় ইলিশ কমছে—এটি ইলিশের পপুলেশনের জন্যও বিপজ্জনক।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। এছাড়া পৃথিবীর মোট ইলিশের প্রায় ৬০ ভাগ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। এখন বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে হয় বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় দাবি করে থাকে।

তারপরও হুট করে কেন বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন এবং একই সঙ্গে মাছটির ওজন কমছে, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠছে।

অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ সময়ে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন। এরপর থেকে গড়ে প্রতিবছরই ইলিশের উৎপাদন বাড়ছিল। প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখাসহ কিছু পদক্ষেপ কার্যকর করার কারণে উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছিল। কিন্তু সেটি হোঁচট খেতে শুরু করেছে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে।

যার প্রভাবে ইলিশের দামও গত দুই বছর ধরে বেশ বাড়তির দিকে। গত সপ্তাহে একজন ক্রেতা চাঁদপুরের আড়তে ৯০০-৯৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি সাড়ে তিন হাজার টাকা দাম দিয়ে কেনার তথ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অপরদিকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে ৮০০-৯০০ গ্রাম ইলিশের কেজিপ্রতি দাম চাওয়া হচ্ছে গড়ে দুই হাজার টাকার বেশি।

কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল। পরের বছর ২০২৩-২৪ সময়ে উৎপাদন হয় ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব না পাওয়া গেলেও কর্মকর্তারা যে ধারণা দিয়েছেন, তাতে উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ টনেরও কম।

আবার বড় সাইজের ইলিশ মাঝে মাঝে পাওয়া গেলেও এখন কম ওজনের ইলিশ বেশি আসছে বলে জানিয়েছেন ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ। তার মতে, ইলিশের জীবনচক্রে তাকে নদী থেকে সাগরে যেতেই হয়। ধারণা করি, সাগর মোহনায় ধরা পড়ে যাওয়ার কারণে নদী থেকে সাগরে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে।


উৎপাদন ও ওজন কমছে কেন?

ইলিশ বিষয়ক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, অক্টোবরে ডিম ছাড়ার পর ৬-৭ মাস ইলিশ মাছ নদীতে থাকে। এরপর নদীর পানি ঘোলা হয়ে যাওয়ার কারণে এপ্রিলের শেষে বা মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সাগরে চলে যায়।

বাংলাদেশের ইলিশের প্রধান বিচরণ এলাকা হলো—চাঁদপুর সদর ও হাইমচর, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে জাজিরা পর্যন্ত পদ্মা নদীতে, মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া নদী, বরিশাল ও বরগুনার কিছু নদী এবং ভোলার তেতুলিয়া নদী অঞ্চল। এসব অঞ্চল থেকেই ইলিশ দক্ষিণাঞ্চল হয়ে সাগরের দিকে চলে যায়।

প্রচুর জাটকা ধরা এবং অবৈধভাবে মাছ ধরার কারণে ইলিশ সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে ২০০০ সালের দিক থেকে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে শুরু করে কর্তৃপক্ষ। পরে এর অংশ হিসেবেই ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে আসছিল সরকার। গত বছর থেকে এই নিষেধাজ্ঞার নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে নদীতে কারেন্ট জাল দিয়ে ছোট ইলিশ ধরা হচ্ছে, আবার সাগরে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপকহারে ৪০ মিটারের কম গভীরতায় এসে ছোট ইলিশ ধরার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

নদী থেকে সাগরে যাওয়ার সময় মোহনায় ধরা হচ্ছে ছোট ইলিশ। আবার সাগরে অবৈধভাবে অতিরিক্ত মাছ ধরা হচ্ছে। ফলে ছোট মাছগুলো রেহাই পাচ্ছে না। এছাড়া দূষণের কারণে নদী ও সাগরে ইলিশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মোল্লা এমদাদুল্যাহ।

তার মতে, নদীর নাব্যতার সংকট ও দূষণের কারণেই প্রধানত ইলিশের উৎপাদন কমেছে। চর পড়ে মাইগ্রেশন রুট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রজনন ক্ষেত্র ও নার্সারি গ্রাউন্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার প্রভাব দেখা যাচ্ছে উৎপাদন ও ওজনে।

প্রসঙ্গত, ইলিশের অভয়াশ্রম আছে দেশে পাঁচটি। এর দুটি হলো পদ্মা ও মেঘনায়। আর একটি করে হলো তেতুলিয়া, গজারিয়া ও কালাবদর নদীতে। আর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীতে একটি অভয়াশ্রম থাকলেও সেটি আর কার্যকর নেই।

ওদিকে সাগরে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলো অবাধে ছোট ইলিশ ধরছে বলে অভিযোগ পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সাগরকে কেন্দ্র করে নতুন একটি প্রকল্প নেওয়ার চিন্তা চলছে বলে জানিয়েছেন মোল্লা এমদাদুল্যাহ। তারপরও চলমান সংকট থেকে উত্তরণে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তবে সাগরে অতিরিক্ত ট্রলার নিয়ন্ত্রণ করে মজুত বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতেই হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এখন বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারত উপকূলের ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছে। সেই প্রকল্পে গবেষক হিসেবে কাজ করছেন ড. আনিসুর রহমান। যেভাবে উৎপাদন ও ওজন কমছে, তা শঙ্কার বিষয়। গবেষণা করে নিশ্চিত হওয়া দরকার কেন ইলিশের উৎপাদন ও ওজন কমছে।

তবে জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ না দিলে বড় মাছ পাওয়া যাবে কীভাবে? পরপর দুই বছর এমন হলেই উৎপাদনে ধস নামে। আবার মিঠাপানির দিকে লবণাক্ত পানি ধেয়ে আসা এবং পানিপ্রবাহের ঘাটতিও উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মোল্লা এমদাদুল্যাহ ও ড. আনিসুর রহমান—উভয়ই বলছেন, ইলিশ সুরক্ষায় নদী ও সাগরে নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।