বিগত সরকারের প্রভাবশালী এই জামাতা এখনও বিপিসি চেয়ারম্যান

রাজউক কর্মকর্তা শ্বশুরের সব দুর্নীতি মুছে দেন দুদক ডিজি জামাতা

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১০:০০ অপরাহ্ন, ২২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১০:০০ অপরাহ্ন, ২২ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর উচ্চ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ সদস্য (এস্টেট) চাকরিকালীন রেজাউল করিম তরফদারের বিরুদ্ধে দেশের সর্বাধিক আলোচিত দুর্নীতির ঘটনা ঘটলেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার কোনো সম্পৃক্ততা পায়নি। আলোচিত ওইসব ফাইলগুলোতে তার সঙ্গে কাজ করা সকলেই দুর্নীতি মামলার আসামি হলেও রেজাউল করিম তরফদারের দুর্নীতি খুবই সুকৌশলে মুছে ফেলা হয়েছে।

শ্বশুরকে বাঁচাতে দুদকে মহাপরিচালকের পদে তদবির করে নিয়োগ নেন জামাতা প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্ম সচিব রেজানুর রহমান। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় প্রভাবশালী এই কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে এখন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই পদে এখনো কিভাবে বিগত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তা কর্মরত আছেন, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

আরও পড়ুন: জুরাইন-শ্যামপুরে ডিএসসিসির উচ্ছেদ অভিযান, জরিমানা আদায় ২৩ হাজার টাকা

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর সদস্য (এস্টেট)সহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘ সময় চাকরি করা রেজাউল করিম তরফদার খুবই আলোচিত নাম। সালাম মুর্শিদীর গুলশানের বাড়ি, বনানীর এফআর টাওয়ার নির্মাণের মতো আলোচিত এক ডজন অপকর্মে দুর্নীতির মামলা হয়েছে। মামলা, অনুসন্ধান বা অভিযোগপত্রের কোথাও তরফদারের নাম নেই।

শ্বশুরের বিরুদ্ধে যখনই কোনো অনুসন্ধান শুরু হয় বা অজান্তে কোনো ক্রমে যদি মামলা হয়েই যায়, চার্জশিটে যেন শ্বশুরের নাম না আসে, কৌশলে জামাই দুদকের মহাপরিচালক তাই করেন। এভাবে অন্তত ৪টি বৃহৎ দুর্নীতি ও জালিয়াতির মামলা থেকে কায়দা করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিচালক (এস্টেট) মো. রেজাউল করিম তরফদারকে।

আরও পড়ুন: গুলশানের আলোচিত বাড়ি সরকারের সম্পত্তি, তিন মাসের মধ্যে ছাড়তে হবে সালাম মুর্শেদীকে

মামলা এবং চার্জশিট থেকে প্রতিবারই নাম কাটানোর ব্যবস্থা করেন দুদকের মহাপরিচালক (তদন্ত-১) রেজানুর রহমান। প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা দুদকে পোস্টিং নিয়ে ২০১৯ সাল থেকে পাহারা দেন শ্বশুর রেজাউল করিম তরফদারের দুর্নীতির ফাইল।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে অন্তত ২৫ জন দগ্ধ হয়ে মারা যান। আলোচিত এই অগ্নিকাণ্ডের পর নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, জালিয়াতি, ঘুষের বিনিময়ে ভবনের ফ্লোর বাড়ানোর অনুমোদনসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রাথমিক অনুসন্ধানে নানা বিষয় উঠে আসে।

তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ২০১৯ সালের ২৫ জুন দুদক পৃথক দুটি মামলা করে। মামলা দায়েরের পরপরই দুদকের মহাপরিচালক (তদন্ত-১) পদে প্রেষণে বদলি হয়ে আসেন যুগ্ম সচিব রেজানুর রহমান।

এজাহারে লিয়াকত আলী খান মুকুলসহ ২৩ জনকে আসামি করা হয়। একটি মামলায় ২০ জনকে আসামি করা হয়, আরেকটিতে ৫ জনকে। শেষোক্ত ৫ জনের মধ্যে ২ জন দুটি মামলাতেই আসামি।

এজাহারে বলা হয়, এফআর টাওয়ারের ১৫ তলা থেকে ২৩ তলা পর্যন্ত অনিয়মের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। শুরুতে ১৫ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনেও মানা হয়নি নীতিমালা।

এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে ছিলেন কাসেম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর উল ইসলাম, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন খাদেম ও কে এ এম হারুন, রাজউকের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান, তৎকালীন অথরাইজড অফিসার-২ সৈয়দ মকবুল আহম্মেদ, সৈয়দ নাজমুল হুদা, সামছুর রহমান, তৎকালীন ইমারত পরিদর্শক মাহবুব হোসেন সরকার, ইমারত পরিদর্শক আওরঙ্গজেব সিদ্দিকী, নজরুল ইসলাম, তৎকালীন সদস্য (এস্টেট) রেজাউল করিম তরফদার ও এ আই এম গোলাম কিবরিয়া, সাবেক পরিচালক (এস্টেট) শামসুল আলম ও আব্দুল্লাহ আল বাকী, সাবেক উপপরিচালক (এস্টেট) মুহাম্মদ শওকত আলী, সাবেক সহকারী পরিচালক শাহ মো. সামসুল আলম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক (এস্টেট) জাহানারা বেগম ও মোফাজ্জেল হোসেন, সাবেক পরিদর্শক মেহেদউজ্জামান, নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক মুহাম্মদ মজিবুর রহমান মোল্লা এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. এনামুল হক।

এজাহারে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬-এর বিধান লঙ্ঘন করেছেন।

তদন্ত শেষে এক বছরের মাথায় ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর দুদক প্লটের মালিক, রাজউকের ১৫ কর্মকর্তাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। এই চার্জশিটে ৭ আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সাত আসামির একজন রাজউকের তৎকালীন সদস্য (এস্টেট) রেজাউল করিম তরফদার। তার দায়মুক্তিতে যাতে প্রশ্ন না ওঠে, এ কারণে দায়মুক্তি দেওয়া হয় আরও ৬ আসামিকে।

এফআর টাওয়ার মামলায় দায়মুক্তি প্রাপ্ত সাবেক এ রাজউক কর্মকর্তার মেয়ের জামাই দুদকের মহাপরিচালক রেজানুর রহমান শ্বশুরের দুর্নীতির ফাইল পাহারা দিচ্ছেন ৫ বছর ধরে। আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এ মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দিক তদন্ত শেষে সাতজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নিয়ে। দুদকের ‘জ্বিনের বাদশা’ বলে পরিচিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগে ইতঃপূর্বে অনুসন্ধান হয়েছিল। হঠাৎ করে তার বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ হওয়া রহস্যজনক। নিষ্ঠুর কায়দায় অব্যাহতি পাওয়া কয়েকজনের নিকট থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ আদায়ের গুঞ্জন রয়েছে। ঢাকায় ১০ তলা বাড়িসহ অবৈধ সম্পদ উপার্জনের জনশ্রুতি আছে। বন্ধ হওয়া দুর্নীতির তদন্ত শুরু করলেই বেরিয়ে আসবে অবৈধ উপার্জনের পাহাড়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, বোরাক রিয়েল এস্টেট কোম্পানি নির্মিত বনানীর ‘হোটেল শেরাটন’-এর নকশার জাল-জালিয়াতিতেও রেজাউল করিম তরফদারের সম্পৃক্ততা থাকলেও নিজ জামাতাই তাকে দায়মুক্তির ব্যবস্থা করেন বলে জানা যায়। এছাড়া রাজধানীর বনানীর প্লট-২৭, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-এর প্লটটির দখলে রয়েছেন প্রভাবশালী একজন রাজনৈতিক নেতা। প্লটটি বরাদ্দ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক জাল-জালিয়াতি ও কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়। এই জালিয়াতির নেপথ্যে ছিলেন রাজউক কর্মকর্তা রেজাউল করিম তরফদার।

এছাড়া রাজউকের প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত আরো ৩টি অনুসন্ধানে তরফদারকে আসামি করার সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু তিনি যেহেতু দুদকের মহাপরিচালকের শ্বশুর, এ কারণে মামলা দায়েরে কমিশনের অনুমোদন মেলেনি।

রাজউক সূত্র জানায়, রেজাউল করিম তরফদার রাজউকের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে তিনি দুই দফা রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম দফায় তিনি ২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। রাজউকে প্রেষণে আসা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার স্থলে দায়িত্ব দেওয়া হয় এস এম জাফর উল্লাহ, বিসিএস (প্রশাসন)। কিন্তু রেজাউল করিমের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে চাকরি না করতে পেরে তিনি ফেরত আসেন।

দ্বিতীয় দফায় তিনি ২০০৫ সালের ২৮ মার্চ থেকে ২০০৬ সালের ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। দুই দফা দায়িত্ব পালনকালে রাজউকের বিভিন্ন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ, আকার ও পজিশন পরিবর্তন, প্লট একীভূতকরণ, হস্তান্তর, সেল পারমিশন, নকশাবহির্ভূত ভবন অনুমোদনসহ বহুমাত্রিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। নামে-বেনামে তিনি অর্জন করেন বিপুল অবৈধ সম্পদ।

রাজধানীর গুলশান-১ এবং গুলশান-২-এ রয়েছে বাড়ি। রামপুরা বনশ্রীতে আছে বহুতল ভবন। এ বাড়িটি মেয়ের নামে কিনেছেন বলে জানা যায়। আর এ বাড়িতেই বসবাস করেন দুদকের মহাপরিচালক রেজানুর রহমান। বেশ কিছু সম্পত্তি কেনেন নিজ স্ত্রীর নামে। ছেলে মাওলানা এহসানুল করিমের নামে উত্তরায় কেনেন প্লট। সেটির ওপর এখন ৬ তলা ভবন। ওটাকে ‘ছেলের বাড়ি’ দাবি করে সেখানে বসবাস করছেন রেজাউল করিম তরফদার।

এখন অবসরে গিয়েও ছেলের নামে লাইসেন্স নিয়ে জুড়েছেন বিশাল ব্যবসা। হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) সূত্র জানায়, ‘আল এহসান হজ অ্যান্ড ওমরা গ্রুপ’ নামে এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে ‘নূর-ই-মদিনা ট্রাভেল’। রাজধানীর পুরানা পল্টনস্থ ১৬৬-১৬৭ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণির আল-রাজী কমপ্লেক্সের (স্যুট নং-ডি-৬০৪) ঠিকানায় রয়েছে ‘এহসান ট্রাভেলস’। এটির শাখা ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায়। দেশের বাইরে তুরস্ক, চীন, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে অফিস।

ঢাকার ১৪৭, ডিআইটি এক্সটেনশন রোডে ‘মেসার্স এহসান ট্রাভেল ইন্টারন্যাশনাল’ নামে আছে আরেকটি ভ্রমণ সংস্থা। ‘মেসার্স এহসান ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস’ নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সিও রয়েছে। ‘এহসান এয়ার ট্রাভেলস’ প্রতিষ্ঠান থেকে হজ (লাইসেন্স নং-২৯৭) এবং ওমরা (লাইসেন্স নং-২৬৬) সেবা দেওয়া হয়। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকা হলেও চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা এবং ফরিদপুরে শাখা রয়েছে বলে জানা যায়।

উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে এহসানুল করিমের নামে রয়েছে ৬ তলা বাড়ি। ৩৪-৩৬ বছর বয়সী তরুণ এহসানুল করিমের পক্ষে উত্তরার মতো এলাকায় বাড়ি, দামী গাড়ি এবং এতগুলো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অসম্ভব বলে উল্লেখ করা হয় একটি রিপোর্টে। মূলত, এসবই রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) রেজাউল করিম তরফদারের বেনামী ব্যবসা।

একইভাবে আওয়ামী লীগের এমপি সালাম মুর্শিদি অবৈধভাবে বরাদ্দ নেওয়া বাড়িটির মামলায় সাবেক সদস্য (এস্টেট) রেজাউল করিম তরফদারকেও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে জামাইয়ের ক্ষমতায়। এই সুযোগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইয়াসির আরাফাত আরো কয়েকজনকে বাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এদিকে প্রশ্ন উঠেছে আলোচিত দুদকের মহাপরিচালক, বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানের ক্ষমতার উৎস নিয়ে। বিগত সরকারের সময় তিনি ছিলেন সবচেয়ে ক্ষমতাধর কর্মকর্তা। দুদকের মহাপরিচালক ছিলেন টানা ৫ বছর। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সময়ও তিনি নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে।