বিতর্কিত ৩ নির্বাচন
এবার বিচারের মুখোমুখি বিতর্কিত তিন নির্বাচনী কর্মকর্তারা
* দুই সিইসি কারাগারে,অন্য কমিশনাররা পলাতক
* ১৮’র আলোচিত রাতের ভোটের ডিসি-এসপি অপসারণ
আরও পড়ুন: ডিবি হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর তদন্তে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
* প্রিজাইডি ও পোলিং অফিসারদের তালিকা তলব, ওসি ও ইউএমওদের রাখা হয়েছে নজরদারিতে
পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে রির্টানিং অফিসার, সহকারী রির্টানিং অফিসার, পুলিশ সুপার, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তাদের বিভিন্ন শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। তবে প্রথম পর্যায়ে আলোচিত রাতের ভোটের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে বিগত বিতর্কিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তদন্তে নামে। এর জন্য গঠন করা হয় একটি তদন্ত কমিশন। এরপরই প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টের আলোচনায় তিনটি নির্বাচনেরই অনিয়ম দুর্নীতি ও ভোট জালিয়াতির তথ্য অনুসন্ধান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠে। তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের সবচেয়ে বেশি অনিয়ম জালিয়াতি উঠে আসে ২০১৮ সালের আলোচিত রাতের ভোটের নির্বাচন নিয়ে। নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলেও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা ভোটের আগের রাতেই ৫০ পার্সেন্টের উপরে আগাম ব্যালট পেপারে ভোট দিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এতে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। তারই প্রেক্ষিতে, ২০১৮ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে গ্রেফতার করে বিভিন্ন মামলায় বিচার করা হচ্ছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২০২৪ সালে কথিত আমি-ডামি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাবিবুল আউয়ালকেও। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এখন মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ায় বাসায় গৃহবন্দী।
আরও পড়ুন: ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা: তথ্যমন্ত্রী
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালের বিতর্কিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (যা ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত) রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা ৩২ জন জেলা প্রশাসককে (বর্তমানে যুগ্ম-সচিব) চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। গত ২৭ জুলাই (সোমবার) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ৩২ জন কর্মকর্তা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। সর্বশেষ তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী, চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকার জনস্বার্থে তাদের কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসর প্রদান করেছে। বিধি অনুযায়ী তারা অবসরজনিত সব সুবিধা প্রাপ্য হবেন। অপরদিকে, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে আগের রাতেই ব্যালট সিল মারা হয়েছিল। প্রশাসন, পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের একটি অংশ তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলকে জেতাতে এই অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে শুধুমাত্র বেসামরিক প্রশাসনের ডিসিরাই নন, এর আগে একই ধরণের নির্বাচনী অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগে ৩৩ জন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকেও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৮ সালের নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক্য পুলিশ সুপারদের তালিকা অনুযায়ী প্রথমে ওএসডি ও সংযুক্ত করে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেয়। সহকারী রিটার্নিং অফিসার উপজেলা নির্বাচন অফিসার এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের তালিকা করে বিভিন্ন শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তাদের অধিকাংশকেই সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়নি। কাউকে ওসি পদে নিয়োগ দিচ্ছে না এই নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করা সকল কর্মকর্তাদের পাসপোর্ট ব্লক করে বিভিন্নভাবে তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নতুন করে প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের তালিকা সংগ্রহ করে আনা হচ্ছে। ১৮ সালের নির্বাচনে পূর্ণ রেজাল্ট সিট নিয়ে এক নাটকীয় ঘটনায় অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব শামসুর আলমকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন সচিব হেলাল উদ্দিন গ্রেফতার করা হয়েছে। পলাতক রয়েছেন যুগ্ম সচিব ফরহাদ খানসহ সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী কর্মকর্তা। এদিকে ২০২৪ সালের অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী রিটার্নিং অফিসার সহকারী রিটারানী অফিসার ও পুলিশ সুপার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নেয়া হয়েছে নানামুখী ব্যবস্থা। তাদের অধিকাংশ কর্মকর্তাকে ওএসডি সংযুক্ত গ্রেফতারসহ বিভিন্ন অপরাধের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একদলীয় নির্বাচনের পালনকারী অধিকাংশ কর্মকর্তায় অবসরে চলে গেছেন। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারাও পলাতক আছেন। তবে তিন বিতর্কিত নির্বাচনের দায়িত্ব পালনের কারণে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় এ ধরনের কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপনে ‘নির্বাচনী অপরাধের’ কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে সরকারি চাকরির নিয়মিত বিধান মেনেই জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চাকুরি ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার যে কাউকে অবসরে পাঠাইতে পারেন। তিনি আরো জানান গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচন কমিশন সদস্য হিসাবে বিগত তিন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। কারণ জনগণের আত্ম অর্জনের তার পরিবর্তনের নির্বাচন বিতর্কের মত ঘটনায় জড়িতদের বিচার না হলে আমরা অপরাধী থেকে যাব।





