মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনে আসছে বড় পরিবর্তন

Sadek Ali
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, ৩০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪১ পূর্বাহ্ন, ৩০ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন চূড়ান্ত
  • এলজিআরডি, স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, পানিসম্পদ, শিল্প মন্ত্রণালয়ে বড় রদবদলের আভাস
  • সেপ্টেম্বরে আসতে পারে কেবিনেট ও মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র ও এলজিআরডি সচিব পদে নতুন মুখ
  • দুর্নীতি বিরোধী অভিযান জোরদার আগামী সপ্তাহে দুদকের নতুন কমিশন
  • সেকেন্ড ইনিংসে কর্মসংস্থান তৈরির আরও ১৮০ দিনের কর্মসূচি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের ১৮০ দিনের টাইমলাইন শেষ হওয়ায় সরকার ও প্রশাসন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে। ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে নির্বাচন পূর্ব প্রতিশ্রুতি সবগুলো শুরু করলেও এখন পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়নের কর্মসূচি নিচ্ছে। পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোরতা, দেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, যোগাযোগ প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে জনবান্ধব প্রশাসন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসাবে রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন। নতুন রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে মনোনয়ন চূড়ান্ত ঘোষণার মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদলের প্রস্তুতি চলছে। একই সাথে জনপ্রশাসন কাঠামোতে আসছে বড় পরিবর্তন। নতুন আরেকটি ১৮০ দিনের ডেট লাইন ঘোষণা করে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসাবে চিনি ও খাদ্য শিল্প, পাটকল কর্পোরেশন, বোয়েসেলসহ ১২ টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সরকারের নীতি নির্ধারণী সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে ১৮০ দিনের কর্মসূচির শেষ হওয়ার পরই সরকারের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হয়েছে।

বিগত ১৭ বছর স্বৈরশাসন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অস্থির প্রশাসনে জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারের ১৮০ দিনের টাইমলাইন কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল। এতে দেশের স্থিতিশীলতা এবং রাজনীতি সরকারের প্রতি আস্থা তৈরি হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাঠামোতে পুনর্গঠন পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। ঠিক কবে এ পরিবর্তন ঘটবে, তার নির্দিষ্ট সময় জানা যায়নি।

আরও পড়ুন: সিলেটে এনসিপির জুলাই পদযাত্রা ঘিরে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলেও ওই সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় তার পদে বহাল ছিলেন। রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে শুধু বিএনপি তাকে সমর্থন দিয়ে আসছিল নির্দিষ্ট সময়ে পর্যন্ত। সরকারের ১৮০ দিনের শেষ পর্যায়ে দ্বিতীয় অধ্যায় টাইমলাইনে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অনেক আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে থাকা স্বাস্থ্যগত কারণে সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম বঙ্গভবনে কার্যক্রম শুরু করেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সাথে সাক্ষাৎ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। অধিবেশন চলমান সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে জানিয়েছে। এদিকে মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই সরকার ১৮০ দিনের কর্মসূচি দিয়ে মন্ত্রিসভার সদস্যদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করার ঘোষণা দিয়েছিল। আগামী ১৭ আগস্ট সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি টার্গেট করে দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর প্রস্তুতি চলছে। রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন চূড়ান্ত হলেই মন্ত্রিসভায় রদবদল করা হবে। একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে সরকারকে বিব্রত করেছেন। তাদের বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসতে পারে। 

একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্ব কমিয়ে সেখানে নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যুক্ত করা হতে পারে। নতুন এ রদবদলে দলের বঞ্চিত সিনিয়র নেতাদের মন্ত্রিসভায় যুক্ত করা হতে পারে। এ ছাড়া মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরও কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যুক্ত করা হতে পারে। জাতীয় সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রেও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। একজন নারী সংসদ সদস্যকে হুইপ নিযুক্ত করা হতে পারে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ৩০টি স্থায়ী কমিটিতে দলের বঞ্চিত নেতাদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই সবগুলো কমিটি গঠিত হবে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। বিএনপির নীতিনির্ধারণীমহল সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অনেক আগে থেকেই প্রার্থী হিসেবে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। এই আবার সেই তিনি বেশ কয়েকবার রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরেই স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হবে। রাষ্ট্রপতির প্রার্থী নিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ডক্টর আব্দুল মঈন খান, ড. ওসমান ফারুকের নাম আলোচনায় আসলেও আগ থেকেই ফখরুল ইসলাম আলমগীর চূড়ান্ত বলে জানা গেছে। দলীয় সূত্র বলছে, মির্জা ফখরুলের পক্ষে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় আসছে। এক যুগের বেশি সময় ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন, কঠিন রাজনৈতিক সময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, তাঁর পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং দলীয় গণ্ডির বাইরেও গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় এগিয়ে রেখেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রকাশ্যে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে মত দিয়েছেন। তবে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দল ও সরকারে একাধিক সাংগঠনিক পরিবর্তন আনতে হবে। সেই টার্গেটকে লক্ষ্য করেই মন্ত্রী পরিষদের উদ্বোধন হচ্ছে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ মন্ত্রণালয়ের সময় দিতে পারছেন না রাজনৈতিক কারণে। রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন চূড়ান্ত হলেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করবেন। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকে দেয়া হতে পারে। পাশাপাশি বিএনপির মহাসচিব পদেও নতুন নেতৃত্ব আসবে। সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে আসতে পারেন পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অথবা হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল। ১৮০ দিনের সবচেয়ে বিতর্কিত আলোচিত সমালোচিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ত্রাণ এবং গতিশীলতা আনতে শিল্প বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পুনর্বিন্যাস হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্ত্রী পরিষদে বড় ধরনের রদবদলের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের পলিসি নীতি নির্ধারকরা নতুন আরেকটি ১৮০ দিনের প্যাকেজ তৈরি করছে। এখানে প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করা কর্মসংস্থান তৈরি ও দুর্নীতি মাদক বিরোধী অভিযান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। আগামী সেপ্টেম্বরে মন্ত্রী পরিষদ সচিব নাসিমুল গনির চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে কৃষি সচিব রফিক এ মোহাম্মদকে নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব করা হতে পারে। মুখ্য সচিব আব্দুস সাত্তার নানা কারণে বিতর্কিত হওয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। স্বরাষ্ট্র সচিব মনজুর মোরশেদ চৌধুরীকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র সচিব করা হতে পারে। পাঁচ মাস অচল হয়ে থাকা দুর্নীতি দমন কমিশনে আগামী সপ্তাহে নতুন কমিশন গঠন করা হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে এই কমিশনের চেয়ারম্যান করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সরকারের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশে-বিদেশে ৫ লাখ লোক কর্মসংস্থানের জন্য টাইমলাইন দিয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া জাপান ও মধ্য প্রাচ্যে শ্রমিক রপ্তানির বড় বাজার ধরছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কল কারখানা চালু করে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্যই চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান, জুটকল কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপি মামুন হাসান, বৈদেশিক সরকারি এমপ্লয়ী প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলে বিএনপিসহ আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১২ নেতাকে এ ধরনের কর্পোরেশনে নিয়োগ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: প্রতিবন্ধী তিন ব্যক্তির হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, মন্ত্রী পরিষদের পরিবর্তন রুটিন ওয়ার্ক। কাজের ভালো-মন্দ-দক্ষতা যাচাই করে প্রধানমন্ত্রী তা করতেই পারেন। এই বিষয়ে সকল এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর।