৫ আগস্টের সেই দিন
কারফিউ ভেঙে জনস্রোত, ‘মার্চ টু ঢাকা’ থেকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন
সরকার ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কারফিউ, রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং টানা কয়েক দিনের সহিংসতার মধ্যেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাজারো ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানী ঢাকায় সৃষ্টি হয় জনসমুদ্র। দিনের শেষ দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন বিজয়ের উল্লাসে রূপ নেয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
৫ আগস্টের আগে কয়েক দিন ধরে দেশজুড়ে সহিংসতা, প্রাণহানি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ বিরাজ করছিল। সরকার অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি করলেও শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কঠোর নিরাপত্তা ও কারফিউ উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণে কর্মসূচিটি শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
আরও পড়ুন: ভিসার নামে প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান ভারতীয় হাইকমিশনের
এর আগের দিন ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানান, পূর্বঘোষিত ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্টই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালিত হবে। বিজ্ঞপ্তিতে দেশজুড়ে মানুষকে ঢাকায় এসে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি বেলা ১১টায় শাহবাগে শ্রমিক সমাবেশ, বিকেল ৫টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নারী সমাবেশ এবং সারা দেশে গণ-অবস্থান কর্মসূচিরও ঘোষণা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও কিংবা আন্দোলনের নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করা হলেও সরকার পতনের এক দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ আর কখনও নির্ভরশীল রাষ্ট্র হবে না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
৫ আগস্ট ভোর থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের কড়া অবস্থান দেখা যায়। মহাখালী, বনানী, গুলশান, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় কাঁটাতারের ব্যারিকেড বসানো হয়। ঢাকায় প্রবেশের প্রধান সড়কগুলোতে স্থাপন করা হয় একাধিক চেকপোস্ট। পুলিশের মাইকিংয়ে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানানো হলেও সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে।
সকালের দিকে ছোট ছোট দলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামতে শুরু করেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন শিক্ষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বেলা ১১টার দিকে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে গেলেও রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের স্রোত শাহবাগের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগসংলগ্ন এলাকায় শতাধিক মানুষ একত্র হন। তাদের হাতে ছিল হ্যান্ডমাইক, মুখে ছিল এক দফার স্লোগান। এ সময় শাহবাগ এলাকায় সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান, সেনাসদস্য এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল।
সাড়ে ১১টার পর শাহবাগ এলাকায় গুলির শব্দ শোনা যায়। চানখাঁরপুলের দিক থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ আসে। দুপুর ১২টার কিছু পর মৎস্য ভবনের দিক থেকে প্রায় ৫০০ মানুষের একটি মিছিল শাহবাগের দিকে অগ্রসর হয়। মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন প্রায় ৫০ জন নারী। সেখানে কিশোর থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।
ওভারব্রিজের কাছে সেনাবাহিনী মিছিলটি থামানোর চেষ্টা করলে সামনের সারির আন্দোলনকারীরা সেনাসদস্যদের হাতে ফুল তুলে দেন। পরে তারা ব্যারিকেড অতিক্রম করে শাহবাগে অবস্থান নেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও মানুষ এসে যোগ দিলে শাহবাগ ও আশপাশের সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
এ সময় সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন—এ খবর রাজধানীজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর শাহবাগে শুরু হয় উচ্ছ্বাস। কেউ আনন্দে কেঁদেছেন, কেউ সিজদায় লুটিয়ে পড়েছেন, আবার কেউ একে অপরকে আলিঙ্গন করেছেন। অনেককে সেনাসদস্যদের সঙ্গে করমর্দন করতেও দেখা যায়। পরে ইন্টারনেট সেবা স্বাভাবিক হলে খবরটি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজারো মানুষ বিজয়ের মিছিল নিয়ে গণভবনের দিকে রওনা হন।
দিনভর কারফিউ, কড়া নিরাপত্তা, ইন্টারনেট বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও ৫ আগস্ট রাজধানীর রাজপথে যে গণজমায়েত সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।





