সারাদেশে আবারও তীব্র গ্যাস সংকট

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১:৪৮ পূর্বাহ্ন, ১৩ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:০৮ পূর্বাহ্ন, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কোনোভাবেই সরকার গ্যাস সংকটের সমাধান করতে পারছে না। শিল্প কলকারখানার উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশজুড়ে সিএনজি পাম্পগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকট ও কম চাপের কারণে চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক পাম্পে গ্যাস থাকলেও পর্যাপ্ত প্রেশার বা চাপ না থাকায় দীর্ঘ লাইন ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদামতো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু পাম্প সম্পূর্ণ বন্ধ থাকছে। একই অবস্থা ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার বাসা-বাড়িতেও। পাইপলাইনের সরবরাহ কমে যাওয়ায় কখনো দিনভর গ্যাস থাকছে না, আবার কখনো অত্যন্ত কম চাপে চুলা জ্বলছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন রান্না ও জনজীবনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এককথায় বলতে গেলে গ্যাস আছে, গ্যাস নেই।

বিদ্যুৎ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, গ্যাস সংকটের সমাধানের জন্য সরকার সকল বিকল্প পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করছে। প্রাকৃতিক পরিস্থিতিও আমাদের কিছুটা বেকায়দায় ফেলেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কবে গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

আরও পড়ুন: রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ মার্কেট-শপিংমল, কমল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সময়সীমা

গ্যাস না পেলে গ্যাসচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। রাজধানীতে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার সিএনজি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এসব যানবাহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে এসব সিএনজিনির্ভর পরিবারের জীবিকাও সংকটে পড়বে।

তবে চালকেরা বলেন, কিছুদিন আগে তেল নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড দেখেছি। এরপর শুরু হলো গ্যাস সংকট। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে দু-একটি ট্রিপের বেশি দেওয়া যায় না। আবার পাম্পে দৌড়াতে হয়। তাদের ভাষ্য, এভাবে জীবন চলে না। তার চেয়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলে সেটি স্পষ্ট করে জানানো হোক। যেদিন পরিস্থিতি ঠিক হবে, সেদিন থেকে আবার দেওয়া হোক। এভাবে মানুষ কষ্ট করবে, কিন্তু গ্যাস পাবে না—এটা হতে পারে না। গ্যাস পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে বা হতে কতদিন লাগবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন চালকেরা।

আরও পড়ুন: প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নতুন প্রধান প্রকৌশলী

জানা গেছে, রাজধানীতে তীব্র থেকে তীব্র আকার ধারণ করেছে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোর গ্যাস সংকট। পাম্পে পাম্পে ঘুরেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। অধিকাংশ পাম্প বন্ধ থাকায় উন্মুক্ত থাকা দু-একটি স্টেশনে কিলোমিটারজুড়ে দেখা দিয়েছে গাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশার দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে মাত্র ২০ থেকে ১০০ টাকার গ্যাস। ফলে সিএনজি ও প্রাইভেটকার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা হাজার হাজার চালক কর্মহীন হয়ে পড়ার শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস পাওয়ার আশায় চালকদের দৌড়াঝাঁপ ও চরম ভোগান্তির এমন চিত্র দেখা যায়। সরেজমিনে জানা যায়, মেরুল বাড্ডার জামান সিএনজি স্টেশন এবং মধ্য বাড্ডার সিএনজি স্টেশনে গ্যাস না থাকায় বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কের পাম্পগুলোর মধ্যে কেবল খিলক্ষেতের পাম্পটি চালু রয়েছে। এছাড়া তেজগাঁও এলাকার আকিজ সিএনজিসহ বেশ কয়েকটি পাম্পে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তবে মালিবাগ, কারওয়ান বাজার এফডিসি গেট, পরিবাগ ও মগবাজারের পাম্পগুলোতে গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল। এর মধ্যে হাজিপাড়া ও মগবাজার পাম্পে গ্যাস নেওয়ার জন্য প্রায় এক কিলোমিটার বিস্তৃত গাড়ির লাইন ছড়িয়ে পড়ে।

চালকরা অভিযোগ করেন, খোলা থাকা পাম্পগুলোতে প্রেশার না থাকায় পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। ১৫০০ সিসির প্রাইভেট কারে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা এবং সিএনজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকার বেশি গ্যাস ঢুকছে না। এমনকি অবিশ্বাস্য হলেও অনেক সিএনজিতে মাত্র ২০ টাকার গ্যাস ঢুকছে।

সিএনজি চালক ইব্রাহিম বলেন, অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। কোথায় গ্যাস দিচ্ছে তা জানতে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে দৌড়াদৌড়ি করছি। মেরুল বাড্ডায় গ্যাস নাই শুনে হাজিপাড়া পাম্পে আসছি, কিন্তু এখানে এক কিলোমিটারের দীর্ঘ লাইন। বাধ্য হয়ে এই লাইনেই দাঁড়িয়ে আছি।

আনোয়ার নামের এক চালক জানান, আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বেলা সাড়ে ১১টায় এফডিসি গেটের পাম্প থেকে মাত্র ৬০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৬০ টাকার গ্যাসে কতক্ষণ গাড়ি চলবে? শুনছি সামনে নাকি আরও কঠিন পরিস্থিতি আসছে, পাম্পে গ্যাসই পাওয়া যাবে না। সরকারই বলে দিক আমাদের এখন কী করার আছে।

প্রাইভেটকার চালক সোহেল রানা আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ১০০ টাকার গ্যাস পেলাম। ১০০ টাকার গ্যাসে ১৫০০ সিসির গাড়ি কতক্ষণ চলবে? অন্য এক চালক ইউনুস বলেন, এভাবে চলতে থাকলে চুক্তি বা দৈনিক জমার ভিত্তিতে যারা গাড়ি চালাই, তাদের না খেয়ে মরতে হবে। দেশে এখন গ্যাস-বিদ্যুৎ সবকিছুর হাহাকার চলছে।

পাম্পের কর্মীরা জানান, মূল লাইনেই তীব্র প্রেশার সংকট থাকায় তারা চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করতে পারছেন না। তেজগাঁওয়ের আকিজ পাম্পের বিক্রয়কর্মী তারেক বলেন, জাতীয় লাইনে গ্যাস না থাকলে আমরা কীভাবে দেবো? হঠাৎ হঠাৎ সামান্য প্রেশার এলে আমরা তা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের তো করার কিছু নেই, আমরা নিরুপায়।

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারসন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর দেওয়া চিঠিতে জানানো হয়, রাজধানীর সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সিএনজি অটোরিকশার জন্য আলাদা নজেলের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়েছে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদ। একই সঙ্গে যেসব পাম্পে সিএনজি অটোরিকশায় গ্যাস দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করা হয়েছে, সেসব স্টেশনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

চিঠিতে সংগঠনটি জানায়, বর্তমানে সিএনজি অটোরিকশা চালকদের পাম্প থেকে গ্যাস কিনতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। রাজধানীর কিছু সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিএনজি অটোরিকশায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। সংগঠনটির দেওয়া তালিকায় ১৩টি সিএনজি স্টেশনের নামে সিএনজি অটোরিকশায় গ্যাস সরবরাহ করা হয় না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি চিঠিতে রাজধানীর সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সিএনজি অটোরিকশার জন্য আলাদা নজেল চালুর ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।

গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীসহ সারা দেশের শিল্পাঞ্চলে ইপিজেড কলকারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসায়ী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক নেতৃবৃন্দ একাধিকবার সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করলেও কোনো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না।

অপরদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বুধবার দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার একাধিক কৌশল নিয়ে কাজ করছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ আলোচনায় এক কার্গো এলএনজি পাওয়ার বিষয়ে তারা আশাবাদী। তবে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করতে হলে কিছুটা সময় প্রয়োজন এবং পর্যাপ্ত আইএসও ট্যাংকও বর্তমানে সহজলভ্য নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে যতগুলো বিকল্প ছিল, আমরা সব বিকল্প নিয়ে কাজ করছি।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষায়, ‘জনদুর্ভোগকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা প্রাণান্তকর চেষ্টা করছি। আমার ধারণা, জনগণ বোঝেন আমাদের চেষ্টার ন্যূনতম কোনো ত্রুটি নেই।’

দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছে।

বর্তমান সংকটের জন্য আগের সরকারের নীতির সমালোচনা করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক সমাধানের পথে যাওয়ার কারণে এখন সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যখন ভুল নীতি আপনি গ্রহণ করবেন, এক সময় তার মাশুল দিতে হবে। বিগত সরকারগুলো কোনো মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সূত্র খোঁজেননি। তাৎক্ষণিক সমাধানের পথে গেছেন বলেই আজকে হঠাৎ করে একটি সংকট হয়েছে।’

প্রতিমন্ত্রীর মতে, এই সংকট এখন না হলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো সময়ে দেখা দিত। তিনি বলেন, ‘আজকে না হলে কাল আসতো।’

এদিকে, প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সামিট টার্মিনালে এলএনজি কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালও বর্তমানে আংশিক সক্ষমতায় চলছে। ফলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, সামিট টার্মিনালে বঙ্গোপসাগরে উত্তাল সমুদ্রের (রাফ সি) কারণে এলএনজি কার্গো অপেক্ষমাণ রয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কার্গোটি খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে এক্সিলারেট টার্মিনালকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে হলে প্রায় ৭২ ঘণ্টা টার্মিনালটি বন্ধ রেখে প্রয়োজনীয় কাজ করতে হবে। কোন সময়ে এ কাজ করলে জনদুর্ভোগ সবচেয়ে কম হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

তিনি জানান, এক্সিলারেট টার্মিনাল বর্তমানে বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে প্রায় ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। ফলে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে বন্ধ এবং অন্যটি আংশিক সক্ষমতায় থাকায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার সঙ্গেও সরকারের আলোচনা চলছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়াকে চিঠি দেওয়ার পর তার (প্রতিমন্ত্রী) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে দেশটির প্রতিনিধিদের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে। এরপর বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল মালয়েশিয়ায় গেছে।