মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ফের অনিশ্চয়তায়

এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ ২৫ প্রধান, ৩১২ সহযোগী নিয়ে প্রশ্ন

Sadek Ali
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৯:০৭ অপরাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৪৭ অপরাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

# তদন্তের দাবি ফখরুল-মোজাম্মেলকে ঘিরে

দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর পারস্পরিক বিরোধে ফের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ২৫টি প্রধান ও ৩১২টি সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কার কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, নিজস্ব চাহিদাপত্রে কর্মী পাঠানোর সুযোগ কতটা থাকবে এবং ব্যয় কত হবে—এসব বিষয়ে এখনো সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। ফলে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মপ্রত্যাশীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—কবে থেকে বাস্তবে কর্মী যাওয়া শুরু হবে এবং কত খরচে। এ পরিস্থিতিতে রিক্রুটিং ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক বায়রা নেতা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামসহ কয়েকজনের ভূমিকা নিয়েও বায়রার একাংশ প্রশ্ন তুলেছে। ফখরুল অবশ্য প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিরোধিতা করছেন না; বরং যোগ্য ও বৈধ সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ চান। অন্যদিকে, তাঁর অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথিভিত্তিক ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী শাহজালাল বিমানবন্দরের ক্যানোপি-২ এলাকার ঘটনার সত্যতা

বিরোধের কেন্দ্রে ২৫ এজেন্সি: মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম—ঋডঈগঝ-এ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য প্রথমে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করা হয়। এতে বায়রার একটি অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করে, নতুন ব্যবস্থায় কার্যত সীমিতসংখ্যক এজেন্সির হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে। পরবর্তীতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, মোট ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি এ প্রক্রিয়ায় সুযোগ পাবে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া সরাসরি ২৫টি এজেন্সি নির্বাচন করেছে; আরও ৩১২টি এজেন্সি সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও প্রক্রিয়ায় থাকবে। ২৫টি এজেন্সি বাংলাদেশের ৪২৩টি এজেন্সির একটি তালিকা থেকে মালয়েশিয়ার উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে বিরোধের মূল জায়গা এখানেই। বায়রার একাংশের দাবি, ৩১২টি সহযোগী এজেন্সি যদি নিজেদের লাইসেন্স ও নিজস্ব চাহিদাপত্রের ভিত্তিতে সরাসরি কর্মী পাঠাতে না পারে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে ২৫টি প্রধান এজেন্সির ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে নতুন নামে পুরোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যায়।

পুরোনো অভিজ্ঞতা সামনে: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের নিয়োগপর্বে সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো নিয়ে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সিন্ডিকেট ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। মালয়েশিয়া ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত করে। এ নিয়ে চলমান তদন্তের পর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সরকার ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আদালতে গৃহীত অভিযোগপত্র ও ২০১৩ সালের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের বিষয়ও যুক্ত ছিল। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৪ পর্বে ২ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত ব্যয়ের অতিরিক্ত ৪৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ নেওয়ার কথাও উঠে এসেছে। ফলে এবার নিয়োগ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো—আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কর্মীদের জন্য স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায় কি না।

আরও পড়ুন: জাতিসংঘ অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

ফখরুল-মোজাম্মেলকে ঘিরে তদন্তের দাবি: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের বর্তমান কাঠামো নিয়ে বায়রার সদস্যদের একাংশের বিরোধিতার মধ্যে মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের ব্যবসায়িক অতীত, বায়রায় দায়িত্ব পালনের সময়কার ভূমিকা, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সংশ্লিষ্টতা এবং বর্তমান অবস্থানের মধ্যে কোনো স্বার্থগত সম্পর্ক রয়েছে কি না—তা নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফখরুলের ভারত সফর ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিদেশ সফর, রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ বা ছবি থাকা—নিজে থেকে অপরাধ বা অবৈধ সমন্বয়ের প্রমাণ নয়। তাই এসব বিষয়ে তদন্ত হলে সফরের তারিখ, সরকারি-বেসরকারি বৈঠকের রেকর্ড, ব্যবসায়িক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নথি এবং শ্রমবাজার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র ছিল কি না—এসব যাচাই করাই হবে আইনসম্মত পদ্ধতি। একইভাবে মোজাম্মেল হক বা অন্য কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’, ‘দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড’ কিংবা কোনো রাজনৈতিক শক্তির হয়ে কাজ করার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কর্মীদের স্বার্থই মূল প্রশ্ন: মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর বাজারটি পুনরায় চালুর উদ্যোগে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা, নিয়োগ ব্যয়, মেডিকেল পরীক্ষা, ভিসা প্রক্রিয়া ও যাত্রার সময়সূচি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও জানিয়েছে, কর্মপ্রত্যাশীরা মেডিকেল পরীক্ষা, খরচ ও কবে যেতে পারবেন—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কর্মপ্রত্যাশীরা যেন কোনো টাকা না দেন, মেডিকেল পরীক্ষা না করান বা পাসপোর্ট জমা না দেন।

এদিকে মালয়েশিয়া ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে ‘জিরো-কস্ট’ ব্যবস্থায় নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। প্রথম ব্যাচের কর্মীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

স্বচ্ছতার পরীক্ষায় নতুন ব্যবস্থা: সরকারি অবস্থান হলো, নতুন ব্যবস্থায় আগের মতো সীমিতসংখ্যক এজেন্সির হাতে পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হবে না। সংসদেও শ্রমমন্ত্রী বলেছেন, সরকার সিন্ডিকেটভিত্তিক সীমিত এজেন্সির ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে চায় না এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে সব লাইসেন্সধারী এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

অন্যদিকে, বায়রার একাংশের দাবি—শুধু ৩১২টি সহযোগী এজেন্সির নাম যুক্ত করলেই হবে না; ঋডঈগঝ-এ যোগ্য এজেন্সিগুলোর সরাসরি ও সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নয়; প্রশ্ন হলো, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর নতুন ব্যবস্থায় কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, কীভাবে এজেন্সি নির্বাচন হবে, কর্মীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা নেওয়া যাবে, অভিযোগের প্রতিকার কীভাবে হবে এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগী অতিরিক্ত অর্থ নিলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া নতুন ব্যবস্থা চালু হলে বিতর্ক আবারও ফিরে আসতে পারে। তাই ফখরুল ইসলাম, মোজাম্মেল হক কিংবা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি এবং একই সঙ্গে পুরো নিয়োগ কাঠামোর নথিভিত্তিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে যেমন বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবসায়িক অধিকার রক্ষা হবে, অন্যদিকে বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় থাকা লাখো মানুষের অর্থ ও ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত থাকবে।

আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার আগে কর্মীদের টাকা, পাসপোর্ট বা মেডিকেল পরীক্ষার বিষয়ে সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়।