সবজির বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর দাপট

Shahrier Islam Pallab
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৭:৪৫ অপরাহ্ন, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৫৩ অপরাহ্ন, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রাজধানীর পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বিক্রেতার হাতে পৌঁছাতেই লাফিয়ে বাড়ছে সবজির দাম। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আড়ত ভাড়া এবং হাতবদলের কারণে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এই দাম কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের এমন চড়া দামের চাপে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ক্রেতাদের। একইসঙ্গে কাঁচাবাজারে সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তি থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। 

আরও পড়ুন: ১৩ বছরের ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় মাদ্রাসাশিক্ষকের স্ত্রী গ্রেপ্তার


গতকাল শুক্রবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ি-ওয়াইজঘাট, খিলগাঁও, বাসাবো, রামপুরা, কাপ্তান বাজার, আজীমপুর, কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে অধিকাংশ সবজি চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত সপ্তাহে কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। 

রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘরে দেখা যায়, প্রতি কেজি পাকা ও কাঁচা টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। মানভেদে দেশি গাজর ১০০ টাকা এবং চায়না গাজর ১৬০ টাকা কেজি দরে মিলছে। বেগুনের ক্ষেত্রে লম্বা বেগুন ৮০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ১০০ টাকা এবং কালো গোল বেগুন ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া শীতের আগাম শিম ১২০ থেকে ১৬০ টাকা এবং দেশি শসা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। অন্যান্য সাধারণ সবজির মধ্যে উচ্ছে, করলা, কাঁকরোল, ঢেঁড়স, ঝিঙে, বরবটি, কচুর লতি ও কচুরমুখী বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ টাকায়। এছাড়া চিচিঙ্গা ও ধুন্দুল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, মূলা ৬০ টাকা, হাইব্রিড পটল ও হাইব্রিড শসা ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং ধনেপাতা ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। পিস হিসাবে আকার ও মানভেদে প্রতিটি লাউ ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং চালকুমড়া, ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি হালি কাঁচা কলা ও লেবুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৫০ টাকা।

এদিকে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে দামের বড় ফারাক দেখা গেছে। পাইকারি বাজারে যে লাউ ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়, খুচরা বাজারে সেই একই লাউ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। একইভাবে পাইকারিতে ২৫ টাকার ঢেঁড়স খুচরায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং ৩২ টাকার ফুলকপি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মূলত পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে এক হাত বদলেই কেজিপ্রতি সবজির দাম বাড়ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারচেয়েও বেশি।

রাজধানীর সাদেক খান পাইকারি আড়তে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, রাজশাহী ও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শাক-সবজি আসছে। সেখান থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা পণ্য কিনে নিয়ে যান। বাজারটিতে শস্যজাতীয় সবজির পাশাপাশি শাকও পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে, যেখানে প্রতি আঁটি কলমিশাক ৩ টাকা, লালশাক ৬ টাকা, পাটশাক ৭ টাকা, মূলাশাক ১০ টাকা এবং পুঁইশাক ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কেজি হিসাবে ঢেঁড়স ২৫ টাকা এবং প্রতি পিস হিসেবে ফুলকপি ৩২ থেকে ৩৫ টাকা ও লাউ ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হতে দেখা যায়। পাইকারি এ আড়তে পাল্লা হিসেবে (৫ কেজি) পেঁপে ৪০ টাকা, উচ্ছে ১৫০ টাকা, বরবটি ১৮০ টাকা, ধুন্দুল ২২০ টাকা, চিচিঙ্গা ও কাঁকরোল ২৫০ টাকা, বেগুন ৩০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৩২০ টাকা এবং শিম ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাদেক খান আড়তের মেসার্স তারানগর বাণিজ্যালয়ের বিক্রেতা মো. আরিফ বলেন, কাঁচামালের দাম বাড়ে-কমে। আজ আড়তে বেগুনের পাল্লা (৫ কেজি) ৩০০ টাকা, চিচিঙ্গা ২৫০ টাকা, কাঁকরোল ২৫০ টাকা, ধুন্দুল ২২০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।

আড়তের কমিশন ও শ্রমিকের মজুরি ৩ টাকা থেকে ৪ শতাংশ খরচ হয়। খুচরা বিক্রেতারা চাইলে আরও কমে বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু তারা ১৫০০ টাকা পুঁজি দিয়ে ১০ ঘণ্টায় ১০০০ টাকা কামাতে চায়। আরেক আড়তদার বলেন, আড়তে সীমিত কমিশন রাখা হয়। সব টাকা তো পরিবহনে চলে যায়। প্রতিটি গাড়ি কয়েক রকম টোল দিয়ে আসতে হয়। আগে যে গাড়ি ১৫ হাজার দিয়ে আসত, এখন সেই ২০ হাজার দিয়ে আসতেও কষ্ট হয়। কৃষক সবজির দাম কম পায় এটা ঠিক, কিন্তু পরিবহন ভাড়াও সবজির ভেতরে যুক্ত হয়। আর সবজিতে মধ্যস্বত্বভোগী বেশি। কৃষক থেকে স্থানীয় পাইকার, তারপর ঢাকার পাইকার, সেখান থেকে খুচরা বিক্রেতা, তারপর ক্রেতা। কয়েক হাত বদলের কারণেও দাম বেড়ে যায়। বাবুল এন্টারপ্রাইজের এক আড়তদার বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব অবশ্যই সবজি বাজারে পড়েছে। আগে যেখানে গাড়িভাড়া ১৮-২০ হাজার টাকা ছিল, সেখানে তা ৩-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বগুড়া থেকে ঢাকায় পণ্য আনতে আগে গাড়িভাড়া ছিল ১৫ হাজার টাকা। এখন তা ১৮-১৯ হাজার টাকা হয়েছে। তবে এ ব্যয় বৃদ্ধির মাত্রা দূরত্বভেদে ভিন্ন ভিন্ন। সব মিলিয়ে পরিবহন ব্যয় আনুমানিক ২৫-৩০ শতাংশ বেড়েছে। চলতি মাসে সবজির দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে পরিবহন ব্যয়েরও বড় ভূমিকা আছে।

রায়েরবাজারে সবজির খুচরা বিক্রেতা রমজান আলী বলেন, পাইকারি বাজার থেকে যে দামে সবজি কিনতে হয়, খুচরা বাজারে সেই দাম ও খরচ হিসাব করেই বিক্রি করতে হয়। আজ এক পাল্লা টমেটো কিনেছি ৫০০ টাকায়। সেই টমেটো খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করছি। কাঁচা মরিচ বিক্রি করছি ১৪০ টাকা কেজি দরে। আকার ও মানভেদে লাউয়ের দাম পড়ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। শীতকালীন সবজির সরবরাহ এখনো বাজারে পর্যাপ্ত না থাকায় দাম তুলনামূলক বেশি। পাইকারি বাজারে বেশি দামে কিনতে হলে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। তিনি জানান, পচনশীল পণ্য হওয়ায় তারা অল্প পরিমাণে সবজি কেনেন এবং দিনের মধ্যেই বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এক দিন অবিক্রিত থাকলে পরদিন সেই সবজি তাজা থাকে না, মানও কমে যায়। তখন বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়, অনেক সময় লোকসানও গুণতে হয়। তিনি আরও দাবি করেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সবজির দাম কমিয়ে বিক্রি করতে হয়। এতে লাভ ধরে রাখা কঠিন হয়। এছাড়া বিক্রি না হওয়া পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, সবজি, মাছ ও মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ধনী শ্রেণির ওপর এর বড় কোনো প্রভাব না পড়লেও সাধারণ আয়ের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত কার্যকর তদারকি ও বাজার মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কারসাজির কারণে দাম অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বাজার বিশ্লেষক ও সাবেক ট্যারিফ কমিশনের সদস্য মোস্তফা আবিদ খান জানান, শুধু সাময়িক পদক্ষেপ নিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজার পরিস্থিতি বুঝতে এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে একটি স্থায়ী কৌশল থাকা জরুরি।