ডেঙ্গুকে পিছনে ফেলে দুইধাপ এগিয়েছে হাম উপসর্গে মৃত্যু

Shahrier Islam Pallab
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৬:৩৯ অপরাহ্ন, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৪৯ অপরাহ্ন, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতের নির্দেশ
  • থামছেই না হাম উপসর্গে মৃত্যু, একদিনে আরও ৭ প্রাণহানি
  • ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২৯৯
  • হাম ও ডেঙ্গু মৃত্যুতে উদ্বেগ চিকিৎসক ও অভিভাবকদের

দেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে প্রাণঘাতি ভয়াল রোগ হাম উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু। একসময় ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। তবে এখন ডেঙ্গুকে পিছনে ফেলে ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু। এরইমধ্যে এই রোগ নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। শিশুদের মধ্যে জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ায় পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম ও হামসদৃশ রোগের বিস্তার প্রতিরোধে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা, টিকাদান কার্যক্রম এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া এর প্রধান লক্ষণ। আক্রান্ত শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে।

আরও পড়ুন: সবজির বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর দাপট

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, হামের উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা এবং টিকাদানের আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব শিশু নির্ধারিত টিকা পায়নি, তাদের টিকাদানের আওতায় আনা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত, মৃত্যুর কারণ নিরূপণ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। ডেঙ্গু ও হামের মতো সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা, জনসচেতনতা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই প্রয়োজন সতর্কতা ও দ্রুত পদক্ষেপ।

জানা গেছে, সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মোট প্রাণহানি ১ হাজার ২১৪ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া গত একদিনে নতুন করে ১ হাজার ১৩৫ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ দেখা গেছে। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত একদিনে শুধু সিলেট বিভাগেই হামের উপসর্গ নিয়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে ঢাকা বিভাগে ২ জন ছাড়াও চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে আরও দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০৪ জন ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১১০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। তাদের নিয়ে এ পর্যন্ত মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৭০ জনে।

আরও পড়ুন: ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মসহ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি: ডাঃ রফিক

এ ছাড়া গত একদিনে নতুন করে ২৫ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন। সবমিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ২৩ হাজার ২৭৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৮ জন। অপরদিকে দেশে ডেঙ্গুতে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২৯৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে সংবাদ বিজ্ঞিপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১ হাজার ২৯৯ জনের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৫৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২১৯ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৭৪ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১১৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৩১ জন, খুলনা বিভাগে ১৪৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১০০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১১৩ জন, রংপুর বিভাগে ৩৮ জন এবং সিলেট বিভাগে ২ জন রোগী। চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে ৩৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১৯ হাজার ৮০১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছে ৬০২৩ জন রোগী। এই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪০৭ জন। দেশে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসক ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া ও শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন অনেক অভিভাবক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত শিশুর শরীরে প্রথমে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে কিংবা রোগীর শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে উঠলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অন্যান্য মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব জটিলতা শিশুর মৃত্যুর কারণও হতে পারে। অন্যদিকে, সন্তানদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা। তাঁদের অনেকেই শিশুদের জ্বর কিংবা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ, শিশুদের জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি দেখা দিলে কিংবা শ্বাসকষ্ট, খাওয়ায় অনীহা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, অচেতনভাব বা পানি পান করতে না পারার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

হাম উপসর্গে মৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ, টিকাদানের বিস্তার এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসক ও অভিভাবকদের উদ্বেগ কমাতে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। শ্রেণিকক্ষ, অফিসকক্ষ, বারান্দা, ছাদ, শৌচাগার ও প্রতিষ্ঠানের আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখাসহ কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে বলা হয়েছে। গত ১৮ অক্টোবর জারি করা এক নির্দেশনায় এসব ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশনায় বিষয়টিকে অতীব জরুরি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা পরিদর্শনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মিরপুর বাংলা কলেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগরীসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, সার্বিক শৃঙ্খলা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক মো. নাজমুল হক স্বাক্ষরিত নির্দেশনাটি অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক, সরকারি ও বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা ও থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।