বিআইডব্লিউটিসিতে বদলি বাণিজ্য ও টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ, চেয়ারম্যানকে ঘিরে অসন্তোষ
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনে (বিআইডব্লিউটিসি) প্রশাসনিক বদলি, দরপত্র ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি কাজ, জ্বালানি বরাদ্দ ও সম্পত্তি ইজারা নিয়ে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান এটিএম আব্দুল বারী ড্যানী। অভিযোগকারীদের দাবি, বদলি বাণিজ্য থেকে শুরু করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায়—বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এতে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ফেরির মাস্টার ও ড্রাইভারদের বদলি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন ফেরি ও নৌযানে কর্মরত মাস্টার-ড্রাইভারদের একাধিকবার বদলি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর এক দিনেই ২৫ জন মাস্টার ও ড্রাইভারকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এসব বদলির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে কয়েক কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য হয়েছে। তবে অভিযোগের পক্ষে আর্থিক লেনদেনের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: বাদাম বিক্রির জীবন থেকে স্কুলের আঙিনায় ৮ বছরের হাসান, পাশে দাঁড়ালেন ডিসি ফরিদা
একইভাবে বিভিন্ন ফেরিঘাটে কর্মরত আটজন সহকারী ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে একযোগে বদলির ঘটনাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নতুন দায়িত্ব পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব বদলির পেছনেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।
জাহাজ বিক্রির দরপত্র বাতিল কেন?
আরও পড়ুন: শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে শ্রমমন্ত্রীর বিদেশ সফর বাতিল
বিআইডব্লিউটিসির নয়টি পুরোনো জাহাজ বিক্রির দরপত্র নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্রে যথাযথ দর জমা পড়ার পরও প্রক্রিয়াটি বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠদের সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কেন দরপত্র বাতিল করা হয়েছিল, সর্বোচ্চ দরদাতাদের প্রস্তাব কী ছিল এবং পুনঃদরপত্রে কারা অংশ নিয়েছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, বাতিলের কারণসংবলিত নথি এবং পরবর্তী কার্যক্রম পর্যালোচনা করলেই অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন দাবির অভিযোগ
সংস্থাটির বিভিন্ন দরপত্র ও ঠিকাদারি কাজে পাঁচ শতাংশ কমিশন দাবি করার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাঁদের অভিযোগ, নির্ধারিত অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট ফাইলে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাইল আটকে রেখে অর্থ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।
এ ছাড়া প্রকল্পের ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, থ্রি অ্যাঙ্গেলস মেরিনের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা এবং এফএমসি ডকইয়ার্ডের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এসব অর্থ কীভাবে, কার মাধ্যমে এবং কোন খাতে লেনদেন হয়েছে, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং আর্থিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
স্বজনপ্রীতি ও ঠিকাদারি কাজ বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, তাঁর ভাতিজা ও ভাতিজিজামাইয়ের নামে পরিচালিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে আপত্তি জানালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলির ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, মালিকানা, দরপত্রে অংশগ্রহণ, কার্যাদেশ এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের পরিচয় পরীক্ষা করা জরুরি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ বণ্টনে স্বার্থের সংঘাত থাকলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, সরকারি অর্থের সুরক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সম্পত্তি, চার্টার ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অভিযোগ
বিআইডব্লিউটিসির বিভিন্ন দোকান ও বাণিজ্যিক জায়গা বাজারমূল্যের তুলনায় কম ভাড়ায় বরাদ্দ দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থার বিভিন্ন নৌযান চার্টার দেওয়ার ক্ষেত্রেও অগ্রিম অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে এসটি নিঝুম দ্বীপ চার্টার দেওয়ার উদ্যোগে প্রচলিত নিয়ম ও স্বচ্ছ দরপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নৌযানের তেলের রেশন বাড়িয়ে অতিরিক্ত অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি সংস্থার গচ্ছিত অর্থ চেয়ারম্যানের পছন্দের ব্যাংকে জমা রাখতে কর্মকর্তাদের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল আর্থিক অবস্থার ব্যাংকে অর্থ রাখার চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগ যাচাইয়ে জ্বালানি বরাদ্দের পুরোনো ও বর্তমান হিসাব, নৌযানের প্রকৃত ব্যবহার, ব্যাংক আমানতের সিদ্ধান্ত, সুদের হার এবং অর্থ জমার অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
দাপ্তরিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন
চেয়ারম্যানের দাপ্তরিক আচরণ নিয়েও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দিনের বড় একটি সময় তাঁর কক্ষে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতি থাকে, যা দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। রাত পর্যন্ত অফিসে অবস্থানের সময় তাঁর ব্যক্তিগত কক্ষে অনিয়ম ও অসংগতিপূর্ণ কর্মকাণ্ড চলে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো, কিরণ নামের এক ব্যক্তি অস্ত্রসহ নিয়মিত চেয়ারম্যানের সঙ্গে চলাফেরা করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনেও ভূমিকা রাখেন এবং অস্ত্র প্রদর্শন করে কাউকে কাউকে ভয়ভীতি দেখান। এমনকি সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাতেও তাঁর অস্ত্র নিয়ে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। ওই ব্যক্তির পরিচয়, অস্ত্রের লাইসেন্স এবং সরকারি স্থাপনায় প্রবেশের অনুমোদন সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।
কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ
এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধানদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কারিগরি বিভাগের পরিচালক স্বেচ্ছায় ছুটিতে রয়েছেন বলেও জানা গেছে। তবে তাঁর ছুটির সঙ্গে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, চেয়ারম্যান বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে নিয়োগ দিয়েছেন এবং একজন প্রতিমন্ত্রী তাঁর ছোট ভাই—এমন বক্তব্য দিয়ে নিজের রাজনৈতিক প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। তবে এ বক্তব্যের সত্যতা এবং এর মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারকে প্রভাবিত করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
জবাবদিহি কোথায়?
বিআইডব্লিউটিসি দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও ফেরি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের বদলি, নিয়োগ, জাহাজ বিক্রি, দরপত্র, জ্বালানি বরাদ্দ এবং ব্যাংক আমানতের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরকারি সম্পদ ও জনস্বার্থ জড়িত। ফলে এসব ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দরপত্র ও বদলিসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা এবং আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হলে রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
এটিএম আব্দুল বারী ড্যানীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁকে খুদে বার্তাও পাঠানো হয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।





