ভূমিকম্প মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
# বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে ৩৪৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ
# ঢাকা শহরের ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে
আরও পড়ুন: পোশাক খাতে অরাজকতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে সরকার
# দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
প্রাকৃতিক দুর্যোগের উর্বর ভূমি বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘ভূমিকম্প’। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ তিনটি গতিশীল টেকটনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মিজ প্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় অত্যন্ত উচ্চ ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক এই ঝুঁকির সাথে যখন যুক্ত হয় অপরিকল্পিত নগরায়ন, ঘনবসতি, বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি করা ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো এবং সংকীর্ণ রাস্তাঘাট—তখন তা এক ভয়াবহ বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, রিখটার স্কেলে ৭ বা তার বেশি মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে। বিগত কয়েক দশকে দেশে বড় কোনো ভূমিকম্প না হলেও, ছোট ও মাঝারি মাত্রার ঘন ঘন কম্পন আসলে এক মহাশক্তিধর ও প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা। ফলে, এই অদৃশ্য ও আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং এর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা বর্তমান সময়ের জন্য অন্যতম প্রধান ও জরুরি চ্যালেঞ্জ। ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও করণীয় বিষয়ে এক সভায় তিনি এই নির্দেশনা দেন।
আরও পড়ুন: মক্কায় ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: তিন সপ্তাহেও সৌদির জবাব পায়নি ঢাকা
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাগুলোয় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরনো ভবন শনাক্ত, ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বললেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস এবং অন্যান্য জরুরি সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, উদ্ধার সরঞ্জামের পর্যাপ্ততা, উদ্ধারকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভূমিকম্পবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম রিজুসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের শঙ্কার কথা বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সে ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র ভূমিকম্প প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশ। ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এ ভূমিকম্পকে ‘ভবিষ্যতের বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কিছু দিন আগে তিনদফা ভূমিকম্পে কেঁপেছে দেশ। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে দেশে ৩৪৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। সারা দেশে ঝুঁকির মুখে থাকা ভবন প্রতিস্থাপনে ব্যয় হতে পারে ৩৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৭৭ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঝুঁকিতে থাকা ভবন খুঁজে বের করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বড় ধরনের মানবিক ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে বাংলাদেশ। টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্ট বা ফাটলরেখায় ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে। এতে দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা আছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নিজেদের একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। যদিও রাজধানীর ভবনগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী নির্মাণ নিশ্চিত করা এবং নগর পরিকল্পিত করার দায়িত্ব রাজউকের। রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনে ‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে প্রস্তুতি ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনার ও মতবিনিময় সভায় রাজউকের পক্ষ থেকে সমীক্ষার তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এমন একটি ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে। গবেষকদের মতে, দেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের একটি ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা পুনরাবৃত্তির চক্র রয়েছে, যা সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পরপর ঘটে। ১৭৬২ সালে আরাকান অঞ্চলে প্রায় ৮ মাত্রার এবং ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। তবে এই চক্রের অর্থ এই নয় যে এখনই ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হবে, এমন ঘটনার সময় নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নথিভুক্ত ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার ভেতরে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭। এর মধ্যে নরসিংদীতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার (৫ দশমিক ৬) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঢাকার ১০০ থেকে ২৬৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি ২৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প বাংলাদেশে যে কোনো সময় ঘটতে পারে। তিনি জানান, অতীতে ১৮৬৯ সালে কাছাড়ে ৭ দশমিক ৫, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল ভূমিকম্পে ৭ দশমিক ১, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৫০ থেকে ২০০ বছরের ভূমিকম্প চক্র বিবেচনায় এখন আবারও বড় ধরনের কম্পনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চারপাশে কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে, যা দেশের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ। এর মধ্যে ময়মনসিংহ থেকে সিলেট হয়ে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ডাউকি ফল্ট সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া আরাকান ফল্ট, নোয়াখালী থেকে সিলেট এবং সিলেট থেকে কাছাড় পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারিগুলোও পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তৈরি করে।
মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, বড় ভূমিকম্প হলে সেটি মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি এখনও যথেষ্ট নয়। জাইকা ও সিডিএমপির এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। তবে কোন ভবনগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তার নির্দিষ্ট তালিকা এখনো নেই। তার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ বাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখই ছোট ভবন, টিনশেড বা বস্তি, যেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রাণহানির ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কিন্তু বাকি প্রায় ৬ লাখ বহুতল পাকা ভবনের মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ ভবন গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে সংস্কার, নির্মাণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে একটি বড় ভূমিকম্প দেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।





