খালেদা জিয়ার কবরে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা

Sanchoy Biswas
এস এম মিজান
প্রকাশিত: ৯:০৭ অপরাহ্ন, ০১ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪৭ অপরাহ্ন, ০১ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কোটি মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চিরদিনের জন্য ইহকালীন সফর শেষ করেছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত হয়েছেন স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে। দেশনেত্রীর জানাজায় দল-মত নির্বিশেষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জাতীয় ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বেগম জিয়াকে দাফন করার ২৪ ঘন্টা পর সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হলে শ্রদ্ধা জানাতে কবরস্থানে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই জিয়া উদ্যানে আসতে থাকেন। দুপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনুমতি দেয়ার পর দলবেঁধে কবরস্থানে প্রবেশ করেন শত শত মানুষ। কবর জিয়ারতের পাশাপাশি দোয়া করেছেন তারা। ফুল নিয়ে এসেছেন অনেকে। কবরের সামনে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে অনেককে। 

এর আগে দাফনের ২৪ ঘন্টা পর আজ বৃহস্পতিবার সকালে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয় জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কবরের যাওয়ার লেক রোড। জিয়া উদ্যানের প্রবেশমুখে নিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা গেছে। দুপুর ১২টার পর জিয়া উদ্যানে সর্বসাধারণের কবর জিয়ারতের অনুমতি দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জানাজায় অংশগ্রহণ করতে ঢাকায় আসা লাখ লাখ মানুষ গ্রামে ফিরে যাওয়ার আগে প্রিয় নেত্রীর কবর জিয়ারত করতে যান। পুরুষের পাশাপাশি নারী, শিশুরাও আসছে বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে। মাজার কমপ্লেক্সের পূর্বপাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করতেও দেখা যায় অনেককে। কাউকে কাউকে বেগম জিয়ার বিভিন্ন কথা মনে করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে দেখা যায়। এছাড়া বেগম খালেদা জিয়ার কবরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রিকশা, ভ্যান ও অটো চালক দলের পক্ষ থেকে কোরআন খতম দেয়া হয়। ১০ জন হাফেজ এই কোরআন খতম দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রধান সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুষার, সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. আশফাকুল সরকার ও সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমানসহ নেতৃবৃন্দ।     

আরও পড়ুন: বিএনপির দুই নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার

আজ সকাল থেকেই সদ্য প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ জিয়া উদ্যানের আশপাশে অবস্থান নিতে থাকেন। সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে দুপুরের দিকে জিয়া উদ্যান এলাকা লোকে লোকারাণ্য হয়ে উঠে। আগতদের কেউ এসেছেন দূর-দূরান্ত থেকে, কেউ অফিসে যাওয়ার পথে একটু সময় বের করে, আবার কেউ দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছেন জিয়া উদ্যানে। কবর জিয়ারত শেষে অনেককে দেখা যায় নীরবে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে, কেউ কেউ স্মৃতিচারণায় মগ্ন, আবার কেউ আশপাশে ঘুরে দেখছেন। অনেক পরিবার তাদের ছোট শিশুদের সঙ্গেও নিয়ে এসেছেন।

বিশেষ করে বিকাল ২টার পর থেকে কবর জিয়ারতকারীদের জনস্রোত আরো বাড়তে থাকে। ভিড়ের মধ্যেই চোখে পড়ে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী অনেক শিশুকেও। এদিন জিয়া উদ্যানে একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্যও নজর কাড়ে। বেগম খালেদা জিয়ার কবরের উল্টো পাশে দেয়াল ঘেঁষে কোরআন তেলাওয়াত করতে দেখা যায় সাতক্ষীরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এসএম মিলনকে। তিনি বলেন, সকাল থেকেই মানুষ এখানে কবর জিয়ারত করতে আসছেন। আমি কোরআন তেলাওয়াত করছি। মহান আল্লাহ যেন আমাদের দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়াকে জান্নাত নসিব করেন।

আরও পড়ুন: তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাদিক কায়েম যা বললেন

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরাও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে উপস্থিত থেকে সারিবদ্ধভাবে ভিড় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছেন। পুলিশ জানায়, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পর্যায়ক্রমে সীমিত সংখ্যক মানুষকে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। সবশেষ বিকাল সাড়ে ৪টার দিকেও বেগম খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায় অনেককে। রাজবাড়ী থেকে ঢাকায় বেড়াতে এসেছিলেন আকলিমা খাতুন। তিনি বলেন, খবর শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ঢাকায় আসার সুযোগ পেয়ে মনে হলো, একবার হলেও খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করে দোয়া করি। আকলিমা খাতুন বলেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, একজন শক্ত নারী নেতৃত্বের প্রতীক ছিলেন। 

বিএনপি নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেছেন। বাবর বলেন, আমাদের নেত্রী জনগণের জানমাল নিরাপত্তায় আপসহীন ছিলেন। তার নির্দেশনায় আমরা র‌্যাব গঠন করেছিলাম। কিন্তু র‌্যাবকে দলীয় স্বার্থে এক ঘণ্টা বা একদিনের জন্যও ব্যবহার করেনি বিএনপি। তিনি বলেন, র‌্যাবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছি, এটা কেউ বলতে পারবে না, প্রমাণ দেখাতে পারবে না। অন্যায় করলে বিএনপি নেতাকর্মীদেরও ছাড় দেয়া হতো না। কবর জিয়ারত করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। আজ সকালে জিয়া উদ্যান পুলিশ বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে কবর জিয়ারত করেন তিনি।

পঞ্চগড় জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করা হয়েছে। এ সময় পঞ্চগড় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাহিরুল ইসলাম কাচু বলেন, আমরা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা থেকে বেগম খালেদা জিয়ার ভালোবাসায় জানাজায় অংশ নিয়েছি। আগামী দিনে তার রেখে যাওয়া জাতীয়তাবাদী আদর্শ বাস্তবায়নে তারেক রহমানের পাশে থাকব।

কুড়িগ্রাম থেকে আসার যুব দলের কর্মী সুলতান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ যত দিন থাকবে ততদিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কেউ ভুলে যাবে না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তাকে স্মরণ করবে, কারণ তিনি গণতন্ত্রের পতাকাকে উড্ডীন করে রাখতে নিজের সব কিছুকে বিসর্জন দিয়েছেন শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে। আমি বিদেশে যাওয়ার আগে নেত্রীর জানাজায় অংশ নিয়েছি। অপেক্ষায় ছিলাম কবর জিয়ারতের। আলহামদুলিল্লাহ, কবর জিয়ারতের সুযোগ পেয়েছি, শুকরিয়া জানাই আল্লাহর কাছে। বিএনপির কর্মী বাড্ডার বাসিন্দা সাইফুল আলম বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতার কবর জিয়ারত করতে কতবার যে নেত্রী এসেছে তার হিসাব বলতে পারবো না। আমি নিজে এসেছি, স্লোগান দিয়েছি নেত্রীর আগমনে। আজকে নেত্রী-ই নেই। আজকে তার কবর আমরা জিয়ারত করছি। এই কথা মনে হলে বুকটা ফেটে যায়, তারপরও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নেত্রীকে নিয়ে গেছেন, এভাবে সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে, এটাই নিয়ম। দোয়া করি, তিনি যেন অনন্ত জগতে ভালো স্থানে থাকেন, বেহেস্তে থাকেন।

নীলফামারীর আমিনুল ইসলাম বলেন, সেই ছোট বেলায় যখন আমি ছাত্র দল করেছি তখন থেকে এ নেত্রীকে দেখেছি, শহীদ রাষ্ট্রপতির কবরে নেতা-কর্মীদের নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসতেন তিনি। আজকে তিনি নেই, আমরা বিএনপি এতিম হয়ে গেছি। তবে নেত্রীর জানাজায় জনসমুদ্র দেখে সাহস পাই যে, আমরা এতিম হলেও আমাদের নেত্রীর পথ ধরে জাতীয়তাবাদের পতাকা উড্ডীন রাখবেন দেশনায়ক তারেক রহমান।

আজ কবর জিয়ারত করতে আসা সাধারণ মানুষের বক্তব্যে উঠে আসে খালেদা জিয়ার রাজসীক এবং সম্মাণি বিদায়। সাধারণ মানুষের মুখে বেগম খালেদা জিয়ার রাষ্ট্র পরিচালনায় আপসহীনতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান, আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান, এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসার চিত্র উঠে আসে। সাধারণ মানুষ মনে করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম জিয়ার ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। যিনি তার নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। যিনি তার সমগ্র জীবন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াই করেছেন, কারাভোগ করেছেন। শেষদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন তিনি। কিন্তু কখনো দেশ ছেড়ে চলে যাননি।  

এছাড়া বেগম খালেদা জিয়ার দেশের প্রতি ভালোবাসা, মাটির প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি ভালোবাসাই দেশের সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করেছে। আর দেশের ক্রান্তিলগ্নে যখন তার অভিভাবকত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনি তার চলে যাওয়ায় মানুষ সবচেয়ে বেশি মর্মাহত হয়েছে। সে কারণেই দেশনেত্রীর নামাজে জানাজায় তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় মানুষ সমবেত হয়েছে এবং চোখের পানি ফেলেছে। বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়ের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন রেখে গেছেন, খালেদা জিয়া সেই পতাকাকে উঁচু করে তুলে ধরেছিলেন। একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পতাকাও তিনি তুলে ধরেছিলেন। একইভাবে তারেক রহমানও সেই পতাকা হাতে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করবেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন, এটাই মানুষের প্রত্যাশা। 

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় গত মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গত বুধবার মানিক মিয়া এভিনিউতে তাঁর নামাজে জানাজায় মানুষের ঢল নামে। ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জানাজা ছিল এটি।