এনসিপির জাতীয় কনভেনশনে অংশ নেয়া বক্তারা

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবে সরকার

Any Akter
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৩:৩৮ অপরাহ্ন, ০৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ৪:৩৭ অপরাহ্ন, ০৩ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সংস্কার নিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে সরকার। এভাবে চললে সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবে। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তাদের বাধ্য করতে হবে। রোববার রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির সহ-প্রধান সারোয়ার তুষার। এছাড়া প্যানেলিস্ট হিসেবে আলোচনা করেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী এবং সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান।সেশনটি মডারেট করেন জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।

আরও পড়ুন: ক্ষমতার কারণে সংস্কার থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে বিএনপি সরকার: আখতার হোসেন

আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনের পরেই আমি বলেছি, এটা প্রতারণা ও প্রবঞ্চণার সংসদ। আমি কেন এলাম এই সংসদে এবং কী পেলাম? যে অধ্যাদেশগুলো আইন করলে সরকারের ক্ষমতা বাড়বে, সেগুলোকে তারা আইনে পরিণত করেছে। কিন্তু যেগুলো সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে, সেগুলো তারা ল্যাপস করে বাতিল করে দিয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে ভোট চুরি করে নির্বাচিত বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিনিধিদের সরাতে একটি বিশেষ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। নির্বাচিত সরকার এসে সেটিকে আইনে পরিণত করেছে। যার মাধ্যমে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই তারা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অপসারণ করতে পারবে। এতে বিরোধী দলের কাউকে তাদের অপছন্দ হলে তাকে সরিয়ে পছন্দমতো প্রশাসক বসাতে পারবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, সরকারের অনেক আমলা বিভিন্ন কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে পারপাস সার্ভ করছে। অনেক আমলাই সরকারি চাকরির এই ট্যাগটাকে ব্যবহার করে বিভিন্ন কোম্পানির পারপাস সার্ভ করে এবং পলিসিতে তারা তাদের ব্যক্তিগত এজেন্ডাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। তিনি বলেন, আমাদের যে জন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, রাষ্ট্রের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেই জায়গা থেকে গভমেন্টকে অনেক দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। এখানে আমাদের সংস্কারের ইনস্টিটিউশনাল, ইন্ডিপেন্ডেন্ট হওয়ার কথা ছিল। আমাদের জুডিশিয়ারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট হওয়ার কথা ছিল। আমাদের আমলাতন্ত্রের জায়গায় একটা ম্যাসিভ রি-স্ট্রাকচার হওয়ার দরকার ছিল। পুলিশ সংসার কমিশন হওয়ার দরকার ছিল। এই সব জায়গা থেকে গভমেন্ট অনেক দূরে সরে গিয়েছে। কারণ গভমেন্টের কাছে মনে হচ্ছে, সে যদি সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে, সবগুলোকে যদি এপ্রোপ্রিয়েট না করতে পারে, সে নাকি সরকার যথাযথভাবে চালাতে পারবে না। তিনি বলেন, এনার্জি ইন্ডিপেন্ডেন্ট না হলে আমাদের যে প্রবলেমটা হবে, দেখা যায় আমাদের এই যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং কমার্শিয়ালে এনার্জির অনেক ক্রাইসিস আছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং কমার্শিয়াল এনার্জি ক্রাইসিসের কারণে আমাদের বাজার বড় হচ্ছে না, বিজনেস বাড়ে না। আমাদের এখানে দেখা যায় প্রচুর পরিমাণ লোডশেডিং এর কারণে আমাদের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলা প্রত্যেক বছর ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেজন্য আপনি যদি আমাদের আশেপাশের দেশগুলোতে দেখেন, ইন্ডিয়াতে দেখেন তারা এনার্জি সোর্সকে ডাইভার্সিফাই করতে পারছে। এখন রিনিউয়েবলে চলে গেছে। পাকিস্তানকে দেখেন ওরা রিনিউয়েবলে অনেক এগিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের একটার পর একটা পাওয়ার প্লান্ট দিয়ে গেছে। কিন্তু এগুলা থেকে আমরা সোর্স করতে পারি নাই। সেটার জন্য আমাদের পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। দিনশেষে আমাদের যেই ইম্পোর্ট ব্যাস এনার্জি সোর্সিং করার যে পদ্ধতি বা আমাদের যেই প্রক্রিয়া ডিপেন্ডেন্সি সেটা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।  দিনশেষে রিনিয়েবলস আমাদের যাইতে হবে।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ নয় ‘সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র’ নীতিতে সরকার চলছে: আনু মোহাম্মদ

ক্ষমতার বাহানায় বিএনপি সরকার আর সংস্কার করতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশভাবে উপভোগ করতে চায়। কিন্তু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়, সেটাকে ক্ষমতার দৃষ্টিতে দেখার যে মানসিকতা, সেখান থেকে তারা এখনো বের হতে পারেননি। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচনটা হতে দেওয়া না হয়, সে কারণে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন। তারা বারবার নোট অব ডিসেন্টের কথা বলছেন। ঐকমত্য কমিশনে যখন আমরা আলাপ করেছিলাম, তখন নোট অব ডিসেন্টের অর্থ এই ছিল যে, আমরা মূল সিদ্ধান্তকে মেনে নিলাম, যার একটা ভিন্ন মত রয়েছে। তিনি সে ভিন্ন মতটা উল্লেখ করে রাখলেন। নোট অব ডিসেন্টটা এখানে মুখ্য বিষয় নয়। এখানে মূল যে সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দলগুলো এবং ঐকমত্য কমিশন উপনীত হয়েছে সেটাই এখানে কার্যকর হবে। 

বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, এখন আমরা শুধু এতটুকুই বলবো, সামনের দিনে আমরা দেখতে চাই, আপনারা আসলে কত ভালো আইন আপনারা নিয়ে আসেন। আমরা সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকব। সেটা শুধু আমরা না, বাংলাদেশে আমজনতা সেটা দেখার অপেক্ষায় আছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ১৯৯১ সালে রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে যেসব সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে তার একটিও বাস্তবায়ন করেনি। ২৪ এর অভ্যুত্থানের পর কী ফল হলো? আমরা একটা প্রতারণামূলক দলের সঙ্গে কাজ করছি। যারা প্রথম থেকে ম্যাটিকুলাসলি প্ল্যান করেছে যেন অভ্যুত্থানের পর আমরা যে স্বপ্ন দেখেছি, তা ভেস্তে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের এলিট, সিভিল-মিলিটারি-বুরোক্রেসি ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। সে কারণে তারা সংস্কারকে ভণ্ডুল করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, কানাডায় যদি কোনও মন্ত্রী এরকম মিথ্যা কথা বলতো, তাকে সেদিনই পদত্যাগ দিতে হতো। তিনি বলেন, নির্বাচনে দুমাসও যায়নি। এরমধ্যে আমাদের আলোচনা করতে হচ্ছে। জুলাই সনদে ও অধ্যাদেশে রেখে যাওয়া গুম, মানবাধিকার, দুদক, বিচার বিভাগসহ একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাতিল করছে সরকার। কাউন্সিল গঠন করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। যার ফলে প্রতিষ্ঠান স্বাধীন থেকে নির্বাহী বিভাগের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারবে। কিন্তু সেটিও হয়নি। এগুলো না হলে প্রধানমন্ত্রী কতৃত্ববাদী হয়ে উঠবে। সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান বলেন, জুলাই সনদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য বিষয়। যার মূল কথা হলো রাষ্ট্রের যে প্রধান তিনটি অঙ্গ রয়েছে তথা বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক রাখা। তিনি বলেন, সুশীল সমাজ বলেছে, এই সনদের সঙ্গে মানুষের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু এটি ভ্রান্ত ধারণা। আরেকটা কথা বলা হয়, আইন করে লাভ নেই, মানুষকে ভালো হতে হবে। এটা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। কারণ মানুষ ফেরেস্তা নয়। ফলে তার হাত-পা বেঁধে দিতে হবে। এটাই সনদের মূলকথা।

সরোয়ার তুষার বলেন, বিএনপি সরকার সংস্কার করতে চায় না। অনেকে এতদিন তাদের একটি ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এটা পরিষ্কার, বিএনপি সরকার আর সংস্কার করবে না। শুধু তাই নয়, দলীয় ও নির্বাচনি ইশতেহারে যে সংস্কারের কথা তারা বলেছে, সেখানে ফেরাও বিএনপির পক্ষে সম্ভব নয়। তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলসহ সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে তারা তা ভঙ্গ করেছে। তিনি বলেন, একটা যুক্তি অনেকে দেন, আমাদের সরকার, তাই আমরা সব জায়গায় আমাদের লোক বসাবো। কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে আপনি দলীয় লোক বসাতে পারেন না। সব জায়গায় বিএনপি দলীয় লোক বসালেও রাষ্ট্রপতি বানানোর মতো একটি লোক বিএনপিতে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত এবং ইতোমধ্যে তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন বলে বিএনপির লোকেরাই বলছেন। সংস্কার বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব এবং বিএনপি সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। গণভোটের জনগণের রায়কে অমর্যাদা না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। 

ভবিষ্যতে যেন মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি না হয় : এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজিত জ্বালানি, অর্থনীতি সংস্কার ও গণভোটবিষয়ক জাতীয় কনভেনশনে অংশ নিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের প্রতি মেগা প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন মেগা প্রকল্পের নামে কোনো ধরনের বড় দুর্নীতি না হয়। সারজিস আলম বলেন, অতীতে মেগা প্রকল্পের নামে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। যার ফলে এসব প্রকল্প দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। তিনি দাবি করেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কোনো ঠিকাদারকে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি ও অর্থ পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এসব অনিয়ম বন্ধ করা জরুরি। বক্তব্যে তিনি অতীত সরকারের সময় বিভিন্ন প্রকল্প ও ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার, ব্যবসায়ী, আমলা ও সাধারণ জনগণ সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কার্যকর নেতৃত্ব দিয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও সংস্কার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি তিনি বলেন, জনগণ এখন সচেতন এবং যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে।