ডিবির সোর্স জালাল হত্যা: দুই পুলিশসহ ৩ আসামির যাবজ্জীবন
দুই যুগেরও বেশি সময় আগে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে সোর্স জালাল আহমেদ শফিকে হত্যার ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যসহ ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোসাদ্দেক মিনহাজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী সহকারী সায়েদুর রহমান রবিবার (০৩ মে) রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, রায় ঘোষণার সময় আসামিরা পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ ও ডিবির ক্যান্টিনের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন।
হত্যাকাণ্ডের শিকার জালাল আহমেদ শফি ডিবির সোর্স ছিলেন। ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কয়েকজন সদস্যের হাতে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়েই খুন হয়েছিলেন তিনি। ওই ঘটনার পর তার লাশ গুমও করা হয়েছিল। অবশেষে হত্যাকাণ্ডের ২৭ বছর পর আলোচিত এ মামলার রায়ে ৩ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলেন আদালত।
আরও পড়ুন: পাঁচ লাখ টাকার কন্ট্রাক্টে প্রাথমিক শিক্ষার গোডাউনে আগুন, আটক ৩
জালাল আহমেদ শফির মরদেহ উদ্ধারের পর রমনা থানার তৎকালীন এসআই এস এম আলী আজম সিদ্দিকী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ সকাল ৬টার দিকে মিন্টু রোডের ডিসি, ডিবি ও ডিসি দক্ষিণের অফিসের ছাদের ওপরে থাকা পানির ট্যাংকের ভেতরে প্যান্ট-শার্ট পরিহিত একজনের মরদেহ রয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। এরপর ওইদিনই রমনা থানায় প্রথমে একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। পরে এই অপমৃত্যুর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন রমনা থানার এসআই এস এম আলী আজম সিদ্দিকী।
দায়িত্ব পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি দেখেন, ট্যাংকের ওপর ঢাকনা দিয়ে ঢাকা রয়েছে। এরপর ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট আবদুস সালাম মিয়াসহ ওইদিন বিকেল ৪টার দিকে আবারও ঘটনাস্থলে যান আলী আজম। পরে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহের সুরতহাল তৈরি করে অর্ধগলিত মরদেহটি ট্যাংক থেকে উদ্ধার করেন। ওই সময় মৃত ব্যক্তির বয়স ৫৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হবে বলে ধারণা করা হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় ওই সময় তার মুখমণ্ডলের ছবি ও হাতের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) ব্যবস্থা নিতে আবেদন করা হয়।
আরও পড়ুন: আশকোনা হজ ক্যাম্পের চুরি হওয়া সৌদি রিয়ালসহ ২ জন গ্রেফতার
অন্যদিকে ‘অজ্ঞাত’ ব্যক্তির মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরদিন ২৬ মার্চ মরদেহটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর ঘটনার তথ্য বের করতে পুলিশের এই কর্মকর্তা গোপনে ও প্রকাশ্যে তদন্ত করেন। ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিকতায় প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। এক বা একাধিক ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ সকাল ৬টার আগে কোনো একসময় তাকে ঘটনাস্থলের ভবনের ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে তাকে হত্যা করে মৃতদেহটি পানির ট্যাংকের ভেতরে গোপন করে রাখে।
এদিকে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর নিহত জালাল আহমেদ শফির ছেলে আব্বাস উদ্দিন বাদী হয়ে ১৯৯৯ সালের ৪ এপ্রিল একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আব্বাস উদ্দিনের এজাহার অনুযায়ী, নিহত জালাল আহমেদ শফি ছিলেন মাইক্রোবাস চালক। প্রথমে নিজের মাইক্রোবাস চালাতেন। পরে নিজের মাইক্রোবাস বিক্রি করে ভাড়ায় চালাতেন। তবে ডিবি পুলিশ কোনো গাড়ি রিকুইজিশন করলে সেই গাড়ি চালানোর জন্য জালালকে ডাকা হতো। এভাবেই ডিবি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
এজাহারে আরও বলা হয়, ডিবির ইন্সপেক্টর জিয়াউল আহসান ও এসআই আরজু প্রায়ই তাকে ডেকে নিতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালের ২০ মার্চ মোহাম্মদপুর থানা এলাকার লালমাটিয়ার বাসা থেকে গাড়ির লাইসেন্স ও চেক বই নিয়ে রাত ৩টায় ডিবি অফিসের উদ্দেশে বের হন জালাল। এর কয়েক দিন পরও বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের ধারণা ছিল- তিনি ঢাকার বাইরে গেছেন। পরবর্তীতে ৩১ মার্চ কয়েকজন লোক জালালের বাসায় গিয়ে তার ছবি দেখিয়ে পরিচয় জানতে চায়। এরপর পরিবারের লোকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে এসে জালালের মরদেহ শনাক্ত করেন।
তদন্ত শেষে ১৯৯৯ সালের ২৭ মে আদালতে আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় রমনা থানা পুলিশ। তবে পুলিশ মামলাটির অভিযোগপত্র দিলেও আদালত অধিকতর তদন্ত করতে আবারও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। এরপর মামলার অধিকতর তদন্ত করেন সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তিনি গোয়েন্দা পুলিশের ড্রাইভার মো. আবদুল মালেক, ডিবির পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) মো. জিয়াউল আহসান, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ ও ডিবির ক্যান্টিনের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেন। একইসঙ্গে ড্রাইভার আবদুল মালেক ছাড়া বাকিদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করেন। এছাড়াও একটি মাইক্রোবাসসহ আলামত হিসেবে বেশকিছু উপকরণ জব্দ করে আদালতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যসহ ৪৫ জনকে মামলার সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়।
অধিকতর তদন্তের পর আদালতে দেয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, পুলিশ পরিদর্শক মো. জিয়াউল আহসান, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুর রউফ ও আনোয়ার হোসেনকে অভিযুক্ত করে রমনা থানা পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছিল। অধিকতর তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে আরও কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। এর বাইরে ড্রাইভার আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়।
পুলিশ পরিদর্শক মো. জিয়াউল আহসান ১৯৯৯ সালের ১৯ মার্চ রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে তাদের টিমে ব্যবহৃত মাইক্রোবাস দিয়ে জালাল আহমেদ শফিকে বাসা থেকে ডেকে আনার জন্য ড্রাইভার আবদুল মালেক, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ এবং ডিবি ক্যান্টিনের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেনকে পাঠান। পরে জিয়াউল আহসানের নির্দেশ অনুযায়ী, লালমাটিয়ার বাসা থেকে তারা জালাল আহমেদ শফিকে নিয়ে রাত ৩টার দিকে ডিবি অফিসে জিয়াউল আহসানের কক্ষে যায়। সেখানে প্রথমে জালালকে পানি খাওয়ানো হয়। পরে তাকে নিয়ে তারা ডিবি অফিসের ছাদে যায়। এরপর ছাদে তাকে মারধর করে হত্যার পর একটি পানির ট্যাংকের মধ্যে জালালের মরদেহ গোপন করে রাখা হয়।
তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। সম্পূরক এই অভিযোগপত্রটি ১৯৯৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান।
জালাল হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে হত্যার কারণ সম্পর্কে বলা হয়, তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় অবৈধ স্বর্ণ, হেরোইন ও মাদক চোরাচালানের তথ্য পাওয়ার জন্য জালাল আহমেদ শফিকে ‘সোর্স’ হিসেবে ব্যবহার করতেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ইন্সপেক্টের জিয়াউল আহসান। এ মামলার আসামিরা জালালের তথ্যের ভিত্তিতে চোরাকারবারিদের আটক করে চোরাচালানের পণ্য নিজেদের দখলে নিতেন। কিন্তু জালালকে তার ভাগ থেকে বঞ্চিত করা হতো।
১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ জালাল বিমানবন্দর এলাকায় একটি স্বর্ণ চোরাচালানকারী চক্রের তথ্য ডিবির অন্য একটি দলকে দিয়ে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হন জিয়াউল আহসান। পরে ১৯ মার্চ রাতে অন্য আসামিদের সহযোগিতায় জালালকে বাসা থেকে ডেকে এনে হত্যা করেন জিয়াউল ও তার সহযোগীরা।





