১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
ভাষা আন্দোলনে ঐক্য জোরালো, প্রস্তুতি চূড়ান্তের পথে
ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ছিল ঐক্য সুদৃঢ় করার এবং আন্দোলনের প্রস্তুতি আরও সংগঠিত করার দিন। আগের কয়েক দিনের ধারাবাহিক কর্মসূচির পর এদিন ছাত্রসমাজ ও আন্দোলনকারীরা ২১ ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে প্রস্তুতিকে আরও গুছিয়ে আনতে মনোযোগ দেন।
আরও পড়ুন: ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে, প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছাত্রসমাজ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ছাত্রনেতাদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন হল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈঠক, আলোচনা সভা এবং সাংগঠনিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। আন্দোলনের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া এবং কর্মসূচির সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয় এসব বৈঠকে।
এই দিন ছাত্রনেতারা স্পষ্ট করে জানান, আন্দোলনের মূল শক্তি হবে ঐক্য। ভাষার প্রশ্নে বিভক্তির কোনো সুযোগ নেই বলে সভাগুলোতে বারবার উল্লেখ করা হয়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলা হয়, আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে হবে, যাতে দাবির নৈতিক অবস্থান আরও শক্ত হয়।
আরও পড়ুন: ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: ভাষা আন্দোলনে গতি, কঠোর অবস্থানে ছাত্রসমাজ
১০ ফেব্রুয়ারি সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হয়। অনেক শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেন এবং সংগঠনের কাজে যুক্ত হন। লিফলেট বিতরণ, সহপাঠীদের সঙ্গে আলোচনা এবং কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত করার কাজ চলতে থাকে।
এদিন সাংস্কৃতিক কর্মীরাও আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন। কবিতা পাঠ, আলোচনা সভা ও দেশাত্মবোধক গানের মাধ্যমে ভাষার দাবিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। এতে আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনের রূপ পেতে থাকে।
ঢাকা শহরের সার্বিক পরিবেশ ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও আশপাশে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়। আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
তবে এই প্রশাসনিক তৎপরতার মধ্যেও ছাত্রসমাজের মনোবল অটুট থাকে। বরং সরকারি নজরদারি আন্দোলনকারীদের মধ্যে আরও সতর্কতা ও ঐক্য তৈরি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১০ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সংগঠনিক শক্তি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই দিন থেকেই আন্দোলন আরও সুসংহত কাঠামো পেতে শুরু করে, যা পরবর্তী দিনগুলোতে বৃহত্তর আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
২১ ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করেছে, তখন ১০ ফেব্রুয়ারি স্পষ্ট করে দেয়- ভাষা আন্দোলন আর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, এটি একটি পরিকল্পিত ও ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের পথে এগোচ্ছে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১০ ফেব্রুয়ারি তাই স্মরণীয় হয়ে আছে ঐক্য ও সংগঠনের দিন হিসেবে।





