বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি: আইসিসির অর্থনৈতিক ক্ষতি

Any Akter
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশিত: ২:৩৭ অপরাহ্ন, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ২:৩৭ অপরাহ্ন, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

একজন ক্রিকেটারকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঢেউ তুলতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। জাতীয় দলের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে আইপিএলের একটি সিদ্ধান্ত এখন আর কেবল ক্রিকেটীয় আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বিষয়টি জড়িয়ে পড়েছে কূটনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যিক স্বার্থের জটিল সমীকরণে।

আইপিএলের নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) মোস্তাফিজুর রহমানকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে ভেড়ালেও পরবর্তীতে তাকে ছেড়ে দেয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছে—এমন আলোচনা ক্রিকেট অঙ্গনে ও কূটনৈতিক মহলে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে মোস্তাফিজের পুরো চুক্তিমূল্য কার্যত লোকসান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান ম্যাচ বয়কট, আইসিসি ডেকেছে জরুরি বৈঠক

তবে বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেট সম্পর্কের টানাপোড়েন সামনে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দেয়, যে টুর্নামেন্ট আয়োজনের কথা ভারত ও শ্রীলঙ্কায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন পাকিস্তানও প্রথমে বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেয়। যদিও পরে তারা জানায়, পুরো টুর্নামেন্ট নয়—শুধু ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করবে।

মোস্তাফিজের ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতি যেখানে প্রায় ৯ কোটির কিছু বেশি রুপি, সেখানে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাণিজ্যিক কাঠামোয় বহুগুণ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। আধুনিক ক্রিকেট এখন আর শুধু মাঠের খেলা নয়; এটি সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বৈশ্বিক দর্শকসংখ্যা নির্ভর বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন: মোস্তাফিজ বিতর্ক: বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বয়কট, শশী থারুরের কড়া মন্তব্য

বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে কিছু ম্যাচকে ‘হাই ভ্যালু ইভেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচকে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈরথ ধরা হয়। বাজার বিশ্লেষকদের রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, টিকিট, স্পনসরশিপসহ সংশ্লিষ্ট সব বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড মিলিয়ে একটি ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ছয় হাজার কোটিরও বেশি।

ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ চলাকালে মাত্র ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন স্লটের মূল্য ২৫ থেকে ৪০ লাখ ভারতীয় রুপি পর্যন্ত হয়ে থাকে। একটি ম্যাচ থেকেই বিজ্ঞাপন বাবদ প্রায় ৩০০ কোটি রুপি আয় হয়—এমন ধারণাও রয়েছে।

এই ধরনের ম্যাচ বাতিল বা বয়কট হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। তারা আগেই বিপুল অঙ্কের অর্থ দিয়ে আইসিসির কাছ থেকে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নেয়। উচ্চ দর্শকসংখ্যার ম্যাচ থেকেই তাদের বিনিয়োগের বড় অংশ উঠে আসে। ফলে নির্ধারিত ম্যাচ না হলে রাজস্ব কাঠামোয় বড় চাপ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি জিওস্টার ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির কথা তুলেছে বলে জানা গেছে। বড় ম্যাচ বাতিল হলে আইসিসির ওপর ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত চুক্তিগত চাপও বাড়তে পারে।

বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের একটি গড় বাণিজ্যিক মূল্য থাকলেও সব ম্যাচ সমান নয়। কিছু ম্যাচের মূল্য অন্যগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভারত–পাকিস্তান দ্বৈরথ। এই ম্যাচ না হলে তাৎক্ষণিক আয় ছাড়াও স্পনসরদের ব্র্যান্ড এক্সপোজার ও চুক্তিভিত্তিক লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ না নিলে তারাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ফি, সম্প্রচার আয়ের অংশ, স্পনসর উপস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রচারণা—সব মিলিয়ে একটি বড় টুর্নামেন্ট মিস করা মানে কয়েক কোটি ডলারের সম্ভাব্য আয় হাতছাড়া হওয়া।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করছে, আধুনিক ক্রিকেট এখন কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়; এটি কূটনৈতিক সম্পর্ক, করপোরেট বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক দর্শকবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একজন খেলোয়াড়কে ঘিরে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তও তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশাল আর্থিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।