মৃদু শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবের আভাস, সূর্যের দেখা নেই ঢাকায়
রাজধানীতে শীতের তীব্রতার সঙ্গে বেড়েছে কুয়াশার ঘনত্ব ও হিমেল বাতাসের দাপট। এদিন বেলা বাড়লেও ঢাকার আকাশে সূর্যের দেখা মেলেনি। ভোর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। শীত ও কুয়াশার কারণে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন। শীতের এই তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর ও রাস্তায় কাজ করা শ্রমজীবীরা। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে তাদের জন্য এই শীত আরও কষ্টকর হয়ে উঠছে।
গতকাল শুক্রবার ভোর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ঘন কুয়াশা দেখা যায়। কুয়াশার কারণে অনেক স্থানে যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হয়েছে। বিশেষ করে ভোর ও সকালের দিকে দৃশ্যমানতা কম থাকায় চালকদের বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে দেখা গেছে। ছুটির দিন হওয়ায় অন্যান্য দিনের তুলনায় সড়কে মানুষের চলাচল কিছুটা কম ছিল। তবে প্রয়োজনের তাগিদে যাদের বের হতে হয়েছে, তাদের পড়তে হয়েছে ভোগান্তিতে। কনকনে ঠান্ডা ও হিমেল বাতাসে একাধিক গরম পোশাক পরেও শীত সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেককে। এদিন মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকায় অনেক এলাকায় দৃষ্টিসীমাও কমে গেছে। ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতে পারেনি ৯টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। তবে টানা শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত চুয়াডাঙ্গা। এরইমধ্যে দু:সংবাদ দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। উত্তর অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। দিনের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও কুয়াশার কারণে শীতের অনুভূতি বজায় থাকবে।
আরও পড়ুন: নতুন বছরের প্রথম দিনে ১৭ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচদিন দেশের আবহাওয়ায় কুয়াশা ও শীতের প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশের অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এতে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং আগামী দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কমার আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, বর্তমানে উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের একটি বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। একই সঙ্গে মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, যার একটি বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এদিন সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া প্রথম দিনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও তা দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, পঞ্চগড়, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা কিছু কিছু জায়গা থেকে প্রশমিত হতে পারে। এদিন সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। দ্বিতীয় দিন আজ শনিবার সকাল ৯টা থেকে সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও তা দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এদিনও কুয়াশার কারণে যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তৃতীয় দিন রোববার (৪ জানুয়ারি) থেকে আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে এবং সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় রাত ও দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। চতুর্থ দিন সোমবার (৫ জানুয়ারি) এবং পঞ্চম দিন মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) একই ধরনের আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ও সারাদেশে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। পঞ্চম দিনে রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এ ছাড়া বর্ধিত পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে সারাদেশে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে।
আরও পড়ুন: ২১ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ সর্বনিম্ন ৭.৫ ডিগ্রি
ঘন কুয়াশা ৯ ফ্লাইট গেলো চট্টগ্রাম ও কলকাতা-ব্যাংকক: ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতে পারেনি ৯টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। এসব ফ্লাইট চলে গেছে চট্টগ্রাম, কলকাতা ও ব্যাংকক। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত কুয়াশায় রানওয়ে দৃশ্যমান না থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে ফ্লাইটগুলোকে বিকল্প তিন বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। শুক্রবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ। তিনি জানান, কুয়াশার কারণে চারটি ফ্লাইট চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে, চারটি কলকাতা বিমানবন্দরে ও একটি ফ্লাইট ব্যাংকক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে সকাল ৯টার পর থেকে সব ফ্লাইট অপারেশন পুনরায় স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়। ডাইভারশন হওয়া ফ্লাইটগুলোকে ফিরিয়ে আনা শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
টানা শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত চুয়াডাঙ্গা: টানা তিন দিন ধরে মাঝারি থেকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গার জনপদ। হাড়কাঁপানো শীত ও ঘন কুয়াশার দাপটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার স্বাভাবিক জনজীবন। কনকনে ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ছিন্নমূল, অসহায় ও দিন আনা দিন খাওয়া খেটে খাওয়া মানুষদের। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৫ শতাংশ। আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, টানা তিন দিন ধরে জেলার ওপর দিয়ে মাঝারি থেকে মৃদু ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা কয়েকগুণ বেড়েছে। চুয়াডাঙ্গার প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, আগামী এক থেকে দুই দিন শৈত্যপ্রবাহ সাময়িকভাবে নাও থাকতে পারে। তবে আগামী মঙ্গলবার অথবা বুধবার থেকে পুনরায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে সময় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ থেকে সাড়ে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
এদিকে কনকনে ঠান্ডায় প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে চাইছেন না। দোকানপাট খুলছে দেরিতে, বাজারগুলোতেও লোকসমাগম স্বাভাবিক দিনের তুলনায় অনেক কম। তবে জীবিকার তাগিদে শীত উপেক্ষা করেই কাজে বের হতে হচ্ছে দিনমজুর, রিকশা ও ভ্যানচালকদের। চুয়াডাঙ্গা শহরের বড়বাজার এলাকায় কথা হয় দিনমজুর আব্দুল মালেকের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই শীতে কাজ করাই সবচেয়ে কষ্টের। কাজ না করলে খাওন জোটে না। শরীর কাঁপে, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতেই হয়। একদিন কাজ না করলে ঘরে চুলা জ্বলে না। একই কথা বলেন ভ্যানচালক রফিকুল ইসলাম। শীতের সকালে ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নেমে তিনি বলেন, ভোরে বের হলে হাত-পা বরফ হয়ে যায়। যাত্রীও কম। তবুও বের না হলে সংসার চলবে কীভাবে? একটা কম্বল থাকলে অনেক উপকার হতো। রিকশাচালক সেলিম মিয়া জানান, শীতের কারণে অনেক যাত্রী রিকশায় উঠতে চায় না। আয় অর্ধেক হয়ে গেছে। রাতে ঘুমাতেও কষ্ট হয়। শীতবস্ত্র পেলে আমাদের মতো মানুষের খুব উপকার হতো। শীত থেকে কিছুটা রক্ষা পেতে জেলার বিভিন্ন মোড়, চায়ের দোকান ও বাজার এলাকায় খড়কুটো, কাঠ ও পুরনো টায়ার জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা গেছে নিম্ন আয়ের মানুষদের। পাতলা জামাকাপড়ে ঠান্ডা সামলাতে গিয়ে অনেককেই চরম কষ্ট করতে হচ্ছে।





