মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর বার্তা আইজিপির

মোহাম্মদপুর-আদাবরে ফ্রি-স্টাইলে চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৩০ অপরাহ্ন, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১০:৩৩ অপরাহ্ন, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ক্রমেই ভেঙে পড়ছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর-আদাবর অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ফ্রি-স্টাইলে চলছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকটাই নীরব-নিষ্ক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশের আইজিপি আজ এক বৈঠকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছেন।

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদপুর-আদাবর-বসিলা এলাকার আইনশৃঙ্খলা কার্যত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পুলিশের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে অপরাধীদের যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। গত ১৮ মাসেও পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হঠাৎ জনবিস্ফোরণ অথবা লোমহর্ষক কোনো ঘটনা ঘটলে প্রতিবাদের প্রবণতা নড়ে সরকারের। অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন মোহাম্মদপুর-আদাবরের পরিস্থিতি।

আরও পড়ুন: সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে বড় রদবদল

সীমিত লোকবল নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না পুলিশ। দিনরাত বিভিন্ন স্পটে চলছে ছিনতাই। নিজেই চাঁদাবাজিতে নেমেছে পুলিশ ও পুলিশের সোর্সরা—এমন অভিযোগ রয়েছে। আদাবরের অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত জাপান গার্ডেন সিটির সামনের ফুটপাতে ১৮টি দোকান বসিয়ে সেখান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে থানা পুলিশ—এমন অভিযোগ ফুটপাত ব্যবসায়ীদের। একদিকে সিটি কর্পোরেশনের নামে চাঁদা, রাজনৈতিক দলের নামে চাঁদা ও পুলিশের চাঁদা দিয়ে অতিষ্ঠ ফুটপাত ব্যবসায়ীরা।

পুলিশের অনুমতিতে কয়েকটি দোকান গভীর রাত পর্যন্ত খোলা রেখে সেখানে মাদকের ব্যবসা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের ছত্রছায়ায় চলা এ ব্যবসায় বাধা দিচ্ছে না কেউই।

আরও পড়ুন: রমজান ও ঈদে নগদ অর্থ পরিবহনে ডিএমপির এস্কর্ট সেবা

নতুন করে বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকাবাসীকে নিয়ে কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে মোহাম্মদপুর ও আদাবরের বাসিন্দারা।

পুলিশ বলছে, অবাঙালিদের বাসস্থান জেনেভা ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই মোহাম্মদপুর-আদাবরের আইনশৃঙ্খলার অর্ধেক উন্নতি হতো। কিন্তু অবকাঠামোগত কারণে অনেক চেষ্টা চালিয়েও জেনেভা ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

ঢাকা উদ্যানের দুটি স্পট, বসিলার তিনটি স্পট, শ্যামলীর একটি স্পট ছাড়াও মোহাম্মদপুর ও আদাবরের আরও অন্তত পাঁচটি স্পটে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও সেদিকে নজর নেই থানা পুলিশের—এমন অভিযোগ রয়েছে। ছিনতাইয়ের শিকার ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা দিতে গেলে উল্টো হয়রানির শিকার হন বলেও অভিযোগ। মাঝে মধ্যে পুলিশের সোর্সের সঙ্গে লেনদেনে বনিবনা না হলে দু-একজন ছিনতাইকারীকে আটক করে থানা পুলিশ। এর বাইরে পুলিশের তেমন কোনো তৎপরতা নেই বলে অভিযোগ।

শনিবার আদাবরের একটি এমব্রয়ডারি ফ্যাক্টরিতে চাঁদার দাবিতে হামলা ও আহত করার ঘটনা নিয়ে রাতে আদাবর থানা ঘেরাও করেন এলাকাবাসী। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থানার সামনে সমবেত হতে থাকেন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে তলব করতে হয়। তাদের চাপে শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা রাসেলসহ তিন সন্ত্রাসীকে আটক করতে বাধ্য হয় আদাবর থানা পুলিশ।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, যখন যে সরকার আসে, সেই সরকারের পরিচয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা শুরু হয়। ঢাকা উদ্যানে প্রতিনিয়ত চাঁদার দাবিতে সন্ত্রাসী হামলা ও ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে আটক রেখে টাকা আদায়ের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা প্রতিদিন ঘটলেও মামলা নিতে চায় না থানা পুলিশ—এমন অভিযোগ রয়েছে। লিখিত অভিযোগ নেওয়া হলেও তা রেকর্ড করা হয় না বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

মোহাম্মদিয়া হাউজিংয়ের মাহবুবুল আলম বলেন, অভিযোগ দেওয়ার দশ দিন পর খোঁজ নিতে গিয়ে পুলিশ জানায় তারা অভিযোগটি খুঁজে পাচ্ছে না। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আদাবর ৭ নম্বর রোডের শাহরিয়ার ফেরদৌস। মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা করতে গেলে মামলা না নিয়ে জিডি করতে বলা হয়। সেই জিডি দুই সপ্তাহ পরও এন্ট্রি না হওয়ায় ২ হাজার টাকা খরচ করে তা এন্ট্রি করতে হয়েছে বলে অভিযোগ। কারণ জিডি ছাড়া মোবাইল ফোনের সিম তোলা কষ্টকর।

একই চিত্র রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলাতেও। যেসব মার্কেট ও শপিংমলে মানুষের বেশি ভিড় জমে, তার সামনেই চলে ছিনতাই। পার্কিং নিষিদ্ধ এলাকায় পুলিশের ছত্রছায়ায় মোটরসাইকেল পার্কিং এবং বাস দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগে ছিনতাইকারীরা সহজেই ভিকটিম করছে নাগরিকদের।

মোহাম্মদপুর ও আদাবরের বড় আকারের একমাত্র শপিংমল টোকিও শপিং সেন্টারের সামনে ১০ টাকা দিলেই রাস্তার ওপর মোটরসাইকেল পার্কিং করতে দেয় ট্রাফিক পুলিশ—এমন অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নির্ধারিত চাঁদা প্রদান করে দাঁড়িয়ে থাকে যাত্রীবাহী বাস। এই যানজটের সুযোগই নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। তাছাড়া রয়েছে ফুটপাতের দোকান। সব মিলিয়ে সন্ত্রাসীদের মূলত সহযোগিতা করছে থানা পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ—এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর।

সাংবাদিক ও অপরাধ বিশ্লেষক এনামুল কবীর রূপম বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হচ্ছে জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই; সম্পর্ক আছে শুধুমাত্র সন্ত্রাসীদের সঙ্গে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এককেন্দ্রিক তৎপরতায় পুলিশ সফল হতে পারছে না। অপরাধের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। দৃশ্যত ঢাকার পুলিশ এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব পুলিশের কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এলাকায় পরিকল্পিতভাবে গণসচেতনতা তৈরি ও জনগণকে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটি গঠন এখন সময়ের দাবি।

চাঁদাবাজি-ছিনতাই প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর বার্তা আইজিপির

ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি), বাংলাদেশ বাহারুল আলম বিপিএম চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যে কোনো মূল্যে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কেউ চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ করলে দলমত নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আইজিপি রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে পুলিশের সকল ইউনিট প্রধান, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল সভায় এ নির্দেশনা প্রদান করেন।

তিনি বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে না। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আইজিপি মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, যে কোনো মূল্যে হাইওয়ে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে। তিনি হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশকেও মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন।

এ সময় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স প্রান্তে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত আইজিরা উপস্থিত ছিলেন।