বর্ষা শেষে ভোটের বাঁশি: ইউপি নির্বাচন দিয়েই কি শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার ভোটযুদ্ধ?
দেশে দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে থাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে চলতি বছরের বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর থেকেই ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। সম্ভাব্য এই নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘিরে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার ( ১৯ মে) বগুড়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মীর শাহে আলম জানান, সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন—এই পাঁচ ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে জেলের হত্যাকারী শাস্তি পাবে আশ্বস্ত করলেন বন প্রতিমন্ত্রী
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থায়ন। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় এবং জাতীয় বাজেটে সেই বরাদ্দ নিশ্চিত করার প্রস্তুতি চলছে। তার ভাষায়, “বাজেট পাস ও নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার পর স্থানীয় সরকার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয় একসঙ্গে বসে চূড়ান্ত তফসিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।”
ইউপি নির্বাচনই আগে, ইঙ্গিত ইসির:
আরও পড়ুন: লন্ডনে প্রবাসীদের ভালোবাসায় সিক্ত কবীর আহমেদ ভূঁইয়া, কফি শপ উদ্বোধন
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ধারাবাহিকতা কেমন হবে—এমন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, কমিশন আপাতত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়েই ভাবছে এবং এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, “প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এরপর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হতে পারে।”
তার ব্যাখ্যায় উঠে আসে প্রশাসনিক বাস্তবতার বিষয়টিও। সাধারণত উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন কাঠামো ও কার্যক্রমে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সম্পৃক্ততা থাকে। ফলে আগে ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন না হলে উপজেলা পরিষদের নির্বাচনী ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, স্থানীয় সরকার কাঠামোর সবচেয়ে নিচের স্তর ইউনিয়ন পরিষদ হওয়ায় এখান থেকেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করা তুলনামূলক বাস্তবসম্মত। কারণ দেশের গ্রামীণ প্রশাসন ও নাগরিক সেবার বড় অংশ এখনো ইউনিয়ন পরিষদনির্ভর।
কেন জরুরি হয়ে উঠেছে ইউপি নির্বাচন:
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর বহু ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিরা অনুপস্থিত বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
এই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, “জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন জরুরি। জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া উচিত ছিল।”
তার মতে, জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তালিকা, গ্রামীণ অবকাঠামোসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বহু সেবা ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক। কিন্তু বর্তমানে অনেক এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির কারণে মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, “গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে ইউনিয়ন পরিষদের ওপর। চেয়ারম্যান বা সদস্য না থাকলে সাধারণ মানুষকে নানা প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।”
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, দেশের বহু ইউনিয়নে প্রশাসনিক কার্যক্রম এখন মূলত সচিবনির্ভর হয়ে পড়েছে। এতে সেবা কার্যক্রম ধীর হয়ে গেছে এবং স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে।
সহিংসতার আশঙ্কা কতটা:
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার জন্য আলোচিত। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতীতে প্রাণহানি, কেন্দ্র দখল, সংঘর্ষ ও প্রভাব বিস্তারের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে কিছু মাত্রায় সহিংসতা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবারের নির্বাচনে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরা অংশ নিলে সহিংসতার আশঙ্কা বাড়তে পারে। তবে দলটি অন্তত আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সাংগঠনিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত না হয়ে নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশ নাও নিতে পারে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির শক্তি পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করে। ফলে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী শক্তি ও স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
নির্বাচন ব্যয় বড় চ্যালেঞ্জ:
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, শুধু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনেই প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, ভোটকেন্দ্র স্থাপন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, ব্যালট পেপার ছাপানো, নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনায় বিপুল ব্যয় হয়।
এছাড়া এবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের কারণেও অতিরিক্ত ব্যয় বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে আলাদা বরাদ্দ রাখার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে একই সময়ে জাতীয় অর্থনীতির চাপ, ভর্তুকি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থসংকটও সরকারের জন্য বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
একসঙ্গে ১৩ সিটি করপোরেশন:
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও একই সময়সীমার মধ্যে আয়োজন করা হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর। কারণ বড় শহরগুলোর নির্বাচনী ফল জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।
বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা-সহ বড় সিটিগুলোর নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল নির্ধারণ শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অতীতের অভিজ্ঞতা:
বাংলাদেশে সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালে, যা ছয় ধাপে সম্পন্ন হয়। ওই নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা, প্রাণহানি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সেই নির্বাচনে বহু স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ভূমিকা ও ভোটার আস্থা পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন মাঠের রাজনীতিকে আবার সক্রিয় করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতারও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে বর্ষা শেষে যদি সত্যিই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়, তাহলে সেটি শুধু ভোট আয়োজনের বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের তৃণমূল প্রশাসন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।





