ডিমের বাজারে ধস, খামারিদের মাথায় হাত

Sadek Ali
আশিকুর রহমান, নরসিংদী
প্রকাশিত: ২:৪৫ অপরাহ্ন, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৩:২৮ অপরাহ্ন, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সম্প্রতি বাজার গুলোতে হঠাৎ করে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ডিমের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত কয়েক বছর ধরে ডিমের বাজারদর বেশি থাকায় এ খাতের খামারিরা উৎপাদন বাড়িয়েছেন ছিলেন। কিন্তু চাহিদার তুলনায় ডিমের উৎপাদন ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিমের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। কয়েক মাস আগেও নরসিংদীতে খামার রেটে লাল ডিম প্রতি পিস ১১ থেকে ১১.৩০ টাকা এবং সাদা ডিম প্রতি পিস ১০ থেকে ১০.৫০ টাকা দামে বিক্রি হয়েছিল। সে অনুযায়ী খামারিরা কিছুটা লাভের আশা দেখলেও বর্তমানে ডিমের বাজারে ধস নামায় খামামিদের গুণতে হচ্ছে বড় ধরনের লোকসান। বর্তমানে খামারিরা লাল ডিম বিক্রি করছেন প্রতি পিস ৯.৪০ টাকা এবং সাদা ডিম ৮.৪০ টাকায় বিক্রি করছেন। ডিম উৎপাদনে বর্তমানে বিভিন্ন ব্যান্ডের খাদ্যের দাম বস্তা প্রতি ২৭০০ থেকে ২৮০০ টাকায় হওয়ায় খামারিরা গড়ে প্রতি ডিমে কমপক্ষে ১ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। 

নরসিংদীর শিবপুরের আক্রাশাল গ্রামের খামারি মাহবুবর রহমান (৩৫) বলেন, ‘শীতকালে সাধারণত ডিমের দাম কিছুটা কমে, কিন্তু এ বছর দাম এতটাই কম যে আমাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। সম্ভবত বাজারের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক বেশি। সে সাথে হু হু করে বাড়ছে খাদ্যের দাম। আমার খামারে ২ হাজার মুরগি রয়েছে, যেখান থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায়টি ১ হাজার ৮৫০টি ডিম পাওয়া যায়। তিনি আরও জানান, গত দুই মাস আগে ডিমের বাজার ভালই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে অক্টোবর মাসে লাল ডিম ৯.৩০ টাকা এবং সাদা ডিম ৮.৪০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজার কমে যাওয়ায় কারণে শুধু একমাসেই প্রায় ৬০ হাজার টাকার মত লোকসান হয়েছে।

আরও পড়ুন: ‎নেত্রকোণায় বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিলসহ মাদক কারবারি আটক

একই এলাকার নতুন উদ্যোক্তা আশিকুর রহমান বলেন, লাভজনক মনে করে এই ব্যবসায় এসেছিলাম্। কিন্তু বর্তমানে ডিম উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি এবং খাদ্যের দাম অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় টিকে থাকাটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ‘আমার খামারে ১২ শ মুরগি রয়েছে। ডিম উৎপাদন ৯০ শতাংশেরও বেশি। প্রতিটি ডিম উৎপাদনে প্রায় ৯.৮০ টাকা থেকে ১০ টাকার মত খরচ হলেও বিক্রি করতে হচ্ছে ৯.৪০ টাকারও কম দামে। উৎপাদন ভালো হলেও যে দামে ডিম বিক্রি হচ্ছে, তাতে খামার চালিয়ে যেতে পারব কিনা এই দুশ্চিন্তা কাজ করছে। তিনি আরও জানান, ডিম উৎপাদনের মূল হলো খাদ্য। আর এই খাদ্য দিন দিন হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত দুই মাসের মধ্যে খাদ্য কোম্পানি গুলো বস্তা প্রতি খাদ্যের দাম ২৫০-৩৫০ টাকা বৃদ্ধি করেছেন। পাশাপাশি ঔষধের দামও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে প্রান্তিক খামারিদের ডিম উৎপাদনে খরচ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সে অনুযায়ী খামারিরা ডিমের দাম পাচ্ছে না। অপ্রত্যাশিত ভাবে ডিমের দাম কমে যাওয়ায় খামারিদের উৎপাদন খরচও উঠছে না, বরং তারা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই ডিম উৎপাদন ঠিক থাকলেও দাম না থাকায় লোকসান দিয়ে বিক্রি করায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অনেক প্রান্তিক খামারি বাজার থেকে ছিটকে পড়বেন। তাই অতিরিক্ত লোকসানের আশঙ্কায় যেকোনো সময় খামার বন্ধ করে দিতে পারি। 

তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষের  আমিষের ঘাটতি পূরণে এবং এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বেকার যুবকদের স্বাবলম্বী হতে এই শিল্পের কোন বিকল্প নেই। নিশ্চয়ই  সরকার দ্রুত একটি নীতিমালা গঠন করে এই শিল্প এবং প্রান্তিক খামারিদের বাঁচিয়ে রাখবেন বলে তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুন: গাজীপুরে সুপ্রিম গার্মেন্টসে আগুন নিয়ন্ত্রণে, পুড়েছে কার্টন ও সুতা

খামার থেকে ডিম নিতে আসা ডিম ব্যবসায়ী পলাশ জানান, শীতকালে শাকসবজি ও অন্যান্য বিকল্প খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ে। এসব পণ্যের দাম সহনীয় হলে মানুষ খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনে, যা ডিমের চাহিদা কমিয়ে দেয়। ফলে অনেক ভোক্তা ডিম কম খাচ্ছেন।  পাশাপাশি খামারের সংখ্যা ও উৎপাদন উভয়ই বেড়েছে।

এবিষয়ে খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আরিফ এন্টারপ্রাইজের পরিচালক হাবিবুর রহমান শাহেদ বলেন, দেশে ডিম উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কারণ গ্রামের বাড়ির উঠানেও মুরগির ডিম উৎপাদন হয়। কেউ হিসাব করে না। তবে আমার ধারণা অনুযায়ী বর্তমানে বাণিজ্যিক খামারগুলো থেকে প্রতিদিন ৫ দশমিক ২ কোটিরও বেশি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় বেশি। খাদ্য ও ঔষধের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, খাদ্য ও ঔষধ তৈরিতে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয় বিদেশ থেকে। আর এসব কাঁচামাল আনতে হয় সমুদ্র পথ দিয়ে। বর্তমানে সমুদ্র পথে অস্থিরতা এবং দেশিয় কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি হওয়ায় খাদ্য৷ ও ঔষধ উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় খাদ্য এবং ঔষধের দাম বৃদ্ধি হয়েছে। তিনি আরও জানান, যদি কোনো কার্টেল থাকত এবং তারা দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, তাহলে ডিমের দাম কখনোই এভাবে কমতে দিত না। বাস্তবতা হলো হাজার হাজার খামারি ও বিক্রেতা প্রতিদিন ডিম বিক্রি করেন। তাই বাজারটি স্বভাবতই প্রতিযোগিতামূলক।