সিডরের স্মৃতি নিয়ে কপ-৩১ এর মঞ্চে বরগুনার মুন্না
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূল। লন্ডভন্ড হয়েছিল জনপদ। বিপর্যস্ত হয়েছিল মানুষের জীবন ও জীবিকা। সেই দুর্যোগের ক্ষত থেকে রেহাই পায়নি উপকূলীয় বরগুনাও। তখন বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নে শিশু মো. খায়রুল ইসলাম মুন্না শৈশবের চোখে দেখা সেই ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষের অসহায়ত্ব আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম তার মনে গভীর ছাপ ফেলে।
সিডরের সেই অভিজ্ঞতা কেবল একটি দুর্যোগের স্মৃতি হয়ে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বদলে তৈরি হয়েছে দায়বদ্ধতা। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই বিশ্বমঞ্চে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলের মানুষের কথা পৌঁছে দেওয়ার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এবার বড় একটি সুযোগ এসেছে মুন্নার সামনে। আগামী নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ এ অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
আরও পড়ুন: ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়: ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইন
খায়রুল ইসলাম মুন্না বলেন, ইতিমধ্যে সম্মেলনের অফিসিয়াল ব্যাজ ও তুরস্কের ভিসা পেয়েছি। ২ নভেম্বর ফ্লাইট নির্ধারিত হয়েছে। ৮ নভেম্বর থেকে সম্মেলন কেন্দ্রিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মুন্নার বাবা মো. সিদ্দিকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী। মা খাদিজা আক্তার বেবী গৃহিণী। ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম মান্নাও পড়াশোনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবামূলক ও জলবায়ুবিষয়ক কর্মকাণ্ডে যুক্ত।
আরও পড়ুন: স্ত্রীকে দিয়ে দেহ ব্যবসার অভিযোগ, মিজান বললেন ‘অভাবের তাড়নায় করেছি’
মুন্নার ভাই আরিফুল ইসলাম মান্না বলেন, শৈশবে সিডরের ভয়াবহতা কাছ থেকে দেখার পর ধীরে ধীরে মুন্নার উপলব্ধি হয় উপকূলের মানুষের সংকট শুধু ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপদ পানির সংকট, জীবিকার অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, শিক্ষার বাধা, পরিবেশের বিপর্যয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা। তাই তিনি তৃণমূল পর্যায়ে তরুণদের সংগঠিত করা, স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি শুরু করেন পথচলা। তবে একটি উপজেলা থেকে শুরু করে বৃহত্তর পরিসরে তরুণদের সম্পৃক্ত করা সহজ ছিল না। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, চ্যালেঞ্জ এবং মানুষের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে তাকে।
দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনে সংগঠিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে মুন্না প্রতিষ্ঠা করেন গ্রিন পিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ, যুব নেতৃত্বের বিকাশ এবং শিশু, কিশোরী ও নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে সংগঠনটি। বরগুনাকে কেন্দ্র করে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও ঢাকায় এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এক হাজারের বেশি তরুণ স্বেচ্ছাসেবক। যারা জলবায়ু ও পরিবেশের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে।
তৃণমূলের অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর নীতিনির্ধারণী আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করতে বিভিন্ন জাতীয় ও যুবভিত্তিক উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন মুন্না। ২০২৬ সালে তিনি লোকাল কনফারেন্স অব ইয়ুথ বাংলাদেশের যোগাযোগ ও গণমাধ্যমবিষয়ক নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ বরিশাল বিভাগের সভাপতি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ইয়ুথ অ্যাডভাইজরি প্যানেলের সদস্য ও কান্ট্রি ম্যানেজমেন্ট টিমে যুব প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এসব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন, তরুণদের অংশগ্রহণ, যোগাযোগসহ নীতিনির্ধারণী আলোচনায় কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে তার। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়নের শিক্ষার্থী হিসেবেও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা, জলবায়ু সংকটের তথ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা মানুষের কাছে তুলে ধরতে আগ্রহী তিনি।
মো. খায়রুল ইসলাম মুন্না বলেন, তুরস্কে অনুষ্ঠেয় কপ-৩১ সম্মেলনে আমি জলবায়ু অভিযোজন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এই দুটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় উপকূলের মানুষের বাস্তবতা তুলে ধরতে চাই। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের তরুণ, জলবায়ু কর্মী ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে চাই।
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সিবিডিপির নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, উপকূলীয় এলাকার একজন তরুণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে মুন্নার কাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি এলাকার জন্য গর্বের বিষয়। ছোটবেলা থেকেই সে উপকূলের নানা সমস্যা দেখেছে। এখন সেই এলাকার মানুষের কথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। আশা করি, মুন্না বিশ্বমঞ্চে বরগুনাসহ পুরো উপকূলের মানুষের দুর্ভোগ, প্রত্যাশা ও অধিকার তুলে ধরবে।





