সুশাসনের অগ্নিপরীক্ষা: দল শুদ্ধির পর এবার প্রশাসনের পালা

Sanchoy Biswas
শেখ এমদাদুল হক মিলন
প্রকাশিত: ৫:০১ অপরাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৬:৪৩ অপরাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এক চরম অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে দেশের রাজনৈতিক আকাশে উদিত হয়েছে নতুন সূর্য। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে তারেক রহমানের সরকার। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের যে কালিমা দলের গায়ে লেপনের চেষ্টা করা হয়েছিল, তা সামলাতে শীর্ষ নেতৃত্বকে কম বেগ পেতে হয়নি। তবে আশার কথা হলো, সরকার প্রধানের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং কঠোর অবস্থানের কারণে দলীয় শুদ্ধি অভিযানে এক দৃশ্যমান সাফল্য এসেছে। দল মরীচিকা মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এখানেই কি দায়িত্ব শেষ?

একটি বড় প্রশ্ন আজ জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে—প্রশাসনকে অশুদ্ধ, দলীয়করণ আর দুর্নীতিগ্রস্ত রেখে শুধু দলকে শুদ্ধ করলেই কি সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব? উত্তরটি খুব সহজ—না, সম্ভব নয়। দল একটি রাজনৈতিক আদর্শের বাহন মাত্র, কিন্তু সেই আদর্শকে বাস্তবে রূপদান করে রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র ও প্রশাসন। চাকা যতই সচল হোক, ভেতরের ইঞ্জিন যদি অচল বা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। তাই সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে দল শুদ্ধির পর এবার প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে।

আরও পড়ুন: মানবিক রাজনীতির অনন্ত দিশারী তারেক রহমান

পর্দার আড়ালের গুঞ্জন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট: 

একটি নির্মোহ বিশ্লেষণে বলতে হয়- দলীয় শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সততা ও সাদামাটা জীবনযাপন সর্বমহলে প্রশংসিত হলেও, ক্ষমতার অলিন্দে সবসময়ই কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ভর করার চেষ্টা করে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক মহলে এবং প্রশাসনের অন্দরে কিছু অস্বস্তিকর গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। শোনা যাচ্ছে, খোদ প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নিয়ে ভেতরে-ভেতরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন: শিকাগোর জিয়াউর রহমান সড়কে জিয়ার স্মৃতি রক্ষায় ডা. ডোনারের নেতৃত্ব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মাঠ প্রশাসনের কিছু চিত্র। বিশেষ করে, বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের সিটি করপোরেশনগুলোতে নিযুক্ত 'সিলেক্টেড' বা মনোনীত প্রশাসকদের কারও কারও বিরুদ্ধে অযাচিত তদবিরের অভিযোগ উঠছে। উন্নয়ন কাজের সাথে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারি সংস্থার ভেতরে গোপনে এ নিয়ে  সমালোচনা চলছে। অথচ লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এখন  পর্যন্ত জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্যের (এমপি) বিরুদ্ধে এই পর্যায়ের তদবির বা হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠেনি। এই পরিস্থিতিটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:

জবাবদিহিতার অভাব: নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জনগণের মুখোমুখি হতে হয় বলে তাদের মধ্যে একধরনের প্রচ্ছন্ন দায়বদ্ধতা থাকে। কিন্তু আমলা বা মনোনীত প্রশাসকেরা সরাসরি জনগণের ভোটে আসেন না বলে অনেক সময় নিজেদের জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে মনে করেন।

 ছায়া সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার ঝুঁকি: 

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যদি কোনো চক্র গড়ে ওঠে, তবে তা পুরো সরকারের অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

উন্নয়ন কাজের গুণগত মান নষ্ট: 

যখন কোনো প্রকল্পের প্রশাসনিক প্রধান অযাচিত তদবির বা হস্তক্ষেপ করেন, তখন কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটে এবং জনমনে অসন্তোষ দানা বাঁধে।

ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এবং জনগণের সুউচ্চ প্রত্যাশা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির প্রতি জনগণের প্রত্যাশার পারদ সবসময়ই একটু ভিন্ন মাত্রার। এটি কোনো নতুন বিষয় নয়; সেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই দেশের সাধারণ মানুষ বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছে। জিয়াউর রহমানের সততা, কঠোর পরিশ্রম এবং উৎপাদনমুখী রাজনীতির যে উত্তরাধিকার দলটি বহন করছে, তার কারণেই জনগণ বারবার বিএনপিকে ভালোবেসেছে। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিএনপিও বিভিন্ন সংকটে জনগণের এই প্রত্যাশা পূরণে সবসময়ই সচেষ্ট থেকেছে।

আজকের প্রেক্ষাপট আরও বেশি সংবেদনশীল। দীর্ঘ দেড়  দশকেরও বেশি সময় দেশের মানুষ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং সীমাহীন লুটপাট প্রত্যক্ষ করেছে। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর গঠিত এই নতুন সরকারের কাছে মানুষের একমাত্র চাওয়া— কোনো অবস্থাতেই যেন নতুন সরকার সেই পতিত সরকারের প্রতিচ্ছবি হয়ে না ওঠে। মানুষ কোনো 'নব্য আওয়ামী লীগ' দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় একটি জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং প্রকৃত অর্থেই জনবান্ধব শাসনব্যবস্থা।

সুশাসন নিশ্চিতে করণীয়: আমাদের গঠনমূলক পরামর্শ

এই ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে সরকারকে শুধু সমালোচনার বৃত্তে বন্দী না করে, সমস্যা সমাধানের সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পথ দেখানোই একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। সুশাসনকে টেকসই করতে সরকারপ্রধানকে কিছু যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে:

 ১. গোয়েন্দা নজরদারি ও ছায়া সিন্ডিকেট ভাঙা :

প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে থাকা ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসা ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব ও কার্যক্রমের ওপর কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে কেউ যেন নীতি নির্ধারণে প্রভাব খাটাতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

২. 'সিলেক্টেড' প্রশাসকদের লাগাম টানা:

বিভাগীয় শহরের সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মনোনীত যেসকল প্রশাসক উন্নয়ন কাজে অযাচিত তদবির বা হস্তক্ষেপ করছেন, তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করতে হবে। কোনো রকম শৈথিল্য না দেখিয়ে তাদের কার্যক্রমকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে তাদের প্রত্যাহার করে সেখানে সৎ ও পেশাদার রাজনৈতিক ব্যক্তি বা  কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিতে হবে এবং প্রতিটি তদবিরের ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

 ৩. আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা ও মেধার মূল্যায়ন :

রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করতে হবে। আমলাদের ফাইল আটকে রাখা বা বিশেষ সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে।

৪. ডিজিটাল ও পেপারলেস গভর্ন্যান্স (ই-গভর্ন্যান্স)

দুর্নীতির বড় উৎস হলো মানুষের সাথে মানুষের সরাসরি লেনদেন। সরকারি সব সেবা এবং বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার ও বিল পাস প্রক্রিয়া শতভাগ ডিজিটাল ও ক্যাশলেস করতে হবে। এতে তদবির সংস্কৃতির কিছুটা হলেও  অবসান ঘটতে পারে।

 ৫. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও দুর্নীতি দমন

দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে। অপরাধী আমলা হোক, মনোনীত প্রশাসক হোক, এমপি হোক, মন্ত্রী হোক কিংবা দলের যে কেউ—আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর করতে হবে।

শেষ কথা:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল একটি বৈষম্যহীন, সাম্য ও সুশাসিত বাংলাদেশ। জনমানুষের সেই বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে আসা এই সরকারের সামনে এখন রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ। দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে সরকারপ্রধান যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন, তার পূর্ণতা পাবে তখনই, যখন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক যন্ত্রকেও একইভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে।

জিয়াউর রহমানের সময় থেকে অর্জিত জনসমর্থন ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হলে বর্তমান সরকারকে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সামান্য কিছু ব্যক্তি বা কর্মকর্তার লোভের কারণে যেন একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন ম্লান না হয়। আশা করি, সরকারপ্রধান তার চিরচেনা কঠোর ও আপসহীন অবস্থান বজায় রেখে দল ও প্রশাসন—উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ণ শুদ্ধি অভিযান সফল করবেন এবং বাংলাদেশকে সুশাসনের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক,  রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক