গ্রামীণ হাট-বাজারের কথা

Any Akter
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশিত: ৫:১৩ অপরাহ্ন, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৭:৪৭ অপরাহ্ন, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তরঙ্গে ভেসে আসা একটা ভিডিও ক্লিপ থেকে জানা গেল বাজারটির নাম আমতলী। আসলে কোন জেলার কোন আমতলীর  হাটের দৃশ্য তা পুরোপুরি ধরা যাচ্ছিল না। তবে নিজের গ্রাম, শৈশবকাল, বাড়ির কাছের রেলস্টেশন সংলগ্ন বাজার, কৃষিনির্ভর গ্রামবাসীর জীবন-জীবিকার কথা চোখে ভেসে ওঠেছে। স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরবর্তী কয়েক বছরও গ্রামের হাটবাজারে এমন রূপচিত্র দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ হাঁস, মুরগি, কবুতর, ডিম নিয়ে বাজারের খোলা জায়গায় বসে আছে। ক্রেতা পছন্দ করলে কিনে নিবে। তবে এগুলো সংখ্যায় খুব কম ছিল, একটি বা দুটি। নিজেদের গৃহপালিত যত্নে পোষা প্রাণী। ক্রেতাও সাধারণ শ্রেণির মানুষ। তারা এগুলো বিক্রি করে অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস  ক্রয় করতো। আজকাল এই দৃশ্যপট হারিয়ে গেছে বললেই চলে। এখন গ্রামেও পোল্ট্রি খামার, মাছের ফিশারি, হাইব্রিড প্রজাতি, কক, পাকিস্তানি, লেয়ার কত নাম হয়েছে। গ্রামের দোকানে দোকানে চিপস, ফান্টা, স্প্রাইট, মজো, পাউরুটি, চানাচুর আর নকল কারখানায় তৈরি নানা মুখরোচক দ্রব্যে সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে  অফুরন্ত, অগণন এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার দেশে মানুষ যেখানে 

যা পাচ্ছে, তা-ই খাচ্ছে। দেশি অর্গানিক জাতের সেই তাজা মাছ, মুরগি, ডিম, দুধ, মাটির মটকিজাত চেপা শুটকি, শাকসবজি, ফলমূল কোনোটাই এখন আর গ্রামবাংলার মানুষেরও নাগালের মধ্যে নেই। মনে হয় শহরটা টুকরো টুকরো হয়ে চলে গেছে গ্রাম, গ্রামান্তরে।

আরও পড়ুন: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: ভোটের উৎসব, শান্তির পরীক্ষা

২.

বাস্তবতা হলো, গ্রামের হাট- বাজারগুলোও সেই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে গেছে। একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের মেঠো রাস্তার হাটও এখন উপজেলা পরিষদ/প্রশাসন থেকে ইজারার বন্দোবস্ত  করে নিয়ে আসা হচ্ছে। যেগুলোর হয়তো প্রয়োজনই ছিল না। থাকতে পারতো গ্রামের আটপৌরে  সাধারণের জন্যে উন্মুক্ত। কিন্তু গ্রামের এক শ্রেণীর অসাধু রাজনীতিসংশ্লিষ্ট (যখন যে দল ক্ষমতাসীন হয়) ব্যক্তিরা স্বউদ্যোগে রাজস্ব আদায়ের নামে এসব করে চলেছে। তারা গ্রামীণ হাট- বাজারকে নিলামে তুলে এনে সাধারণ কৃষক, গরীব, দিনমজুর শ্রেণীর ওপর আর্থিক চাপ ও মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে। এদের প্রচ্ছন্ন চাঁদাবাজির কারণে কৃষক তার পণ্য যথাযথ মূল্যে বিক্রি করতে পারছে না। তারা স্বাধীনভাবে হাটে বসে বা দাঁড়িয়ে নিজের গৃহের আঙ্গিনায় উৎপাদিত  পণ্য বা শাকসবজি বিক্রি করতে গেলেও চাঁদা দিতে হচ্ছে। কারণ তারা ইজারাদার, সরকারকে রাজস্ব দিয়ে এনেছে। ফলশ্রুতিতে হাটে টাটকা জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় না হয়ে বাজারের অভ্যন্তরীন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কম মূল্যে ক্রয় করে নিয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি করে  চলেছে। তারা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে এবং ক্রেতাকে তাদের দামেই কিনতে বাধ্য করে। এক্ষেত্রে পঁচনশীল কাঁচা সবজি পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা হয়ে থাকে। জানা যায়, কাঁচামাল বা সবজি বাসী বা পঁচে গেলেও তারা কম দামে বিক্রি করে না। প্রয়োজনে আবর্জনা হিসেবে ফেলে দিবে তবুও না। কাজেই মানুষ বাধ্য হয়েই চড়া 

আরও পড়ুন: নির্বাচনের ছায়ায় রক্তাক্ত রাজনীতি: সহিংসতার অদম্য প্রবণতা

দামে কিনে নেয়। অথচ অতীতের মতন বাজারে গ্রামের মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকলে ভালো টাটকা জিনিস কম মূল্যে ক্রয় করতে পারতো। অবস্থাদৃষ্ঠে দেখা যায়, সারাদেশেই এমন দুর্বিষহ সিন্ডিকেটের এক অভয়ারণ্য সৃষ্টি হয়ে আছে। একে স্পর্শ করে সাধ্য কার ? কে ভাঙতে পারে এমন প্রকাশ্যে দৌরাত্ম্য ও নৈরাজ্য? 

৩.

গ্রামীণ জনপদে আরও একটি অদ্ভুত দৃশ্য নজর কাড়ে, তা হলো 

যত্রতত্র হাট বাজারের সৃষ্টি। বিগত দুই দশকে দেশজুড়ে সড়ক যোগাযোগের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আশীর্বাদে রাস্তার ওপর গড়ে ওঠছে বাজার। কোনো একটা সংযোগ সড়ক বা ছোটখাটো চৌরাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্টান ঘিরে  রাতের মধ্যে মাজার সৃষ্টি হওয়ার মত বাজার বসে যাচ্ছে। এ যেন হঠাৎ গজে ওঠা এক আশ্চর্য জনঅরণ্য। প্রাথমিকভাবে সঙ্গে দুয়েকটা চা স্টল, কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার, একজন পান সিগারেটের বাক্স নিয়ে বসে পড়লো, একপাশে ব্রয়লার মুরগির একটা উদাম চাল, সকালে দুধ বিক্রির জন্য দু'চারজন বৃদ্ধ কৃষক হাতে জগ নিয়ে হাজির। এসব নিয়েই হয়ে গেল আজগুবি এক বাজার। আর ঠেকায় কে? কারও অনুমতি নেয়ার অবকাশ নেই, সরকার, জনপ্রশাসন নীরব। রাস্তায় যানজট, দুর্ঘটনা, মৃত্যু, কলহ, মামলা মোকদ্দমার অবস্থা সবই নিত্যদিনের চিত্র। আর এজাতীয় পথবাজারগুলোও (street market) চাঁদাবাজির হাত থেকে মুক্ত নয়। হাটবাজারের জন্যে সরকারের বিদ্যমান নীতিমালা রয়েছে, যদিও এ-সবের তোয়াক্কা করছে না কেউ । গ্রামে রাস্তা দখল করে হাট বসানোর পেছনে থাকে স্হানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য। আজকাল বাজার হাট, ছোটখাটো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ওয়ার্ড পর্যায়ের পদ-পদবি, রাস্তায় বুকচিতিয়ে দাঁড়িয়ে যানবাহনের টোকেন দেওয়ার দায়িত্ব প্রদান ইত্যাদি বিতরণ করেই তৃণমূল রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। এগুলোই গ্রামীণ রাজনীতির মূলমন্ত্র হয়ে ওঠেছে। ধীরে ধীরে এটাই যেন দেশের জন্যে এক অপ্রতিরোধ্য নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে বেরিয়ে না আসা অবধি নির্বাচন, গণতন্ত্র, সুশাসন প্রত্যাশা করা নিরর্থক এবং অরণ্যেরোদন ছাড়া কিছু আর কিছু হবে না। 

৪.

সকলের জানা আছে, গ্রামের বাজারগুলোতে নিজস্ব কমিটি রয়েছে। এদের প্রধান কাজ হলো অভ্যন্তরীন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ কমিটির নির্বাচনেও সরকার দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এটা সবসময়ই কমবেশি ছিল। স্হানীয় নেতাদের মধ্য থেকে ভোটের মাধ্যমে বা ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন হয়ে থাকে। 

হাট-বাজারের জন্যে পাহারাদার, ঝাড়ুদার, সুইপার নিয়োগ করা এদের কাজ। যদিও পয়ঃপ্রণালী, পাবলিক টয়লেট, শেড, ভেতরের গলি মেরামতের দায়িত্ব সরকারের। এর জন্য স্হানীয় সরকার বিভাগের বাৎসরিক বরাদ্দ আছে। তথাপি এ-সবের অজুহাতে বাজারের  স্হায়ী দোকান এবং বাইরে বসা ভাসমান বিক্রেতাকেও চাঁদা গুনতে হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সভা-সমিতি, পূজা-পার্বন, উৎসব উদযাপন, নেতার আগমন, তোরণ নির্মান, সংবর্ধনা ইত্যাদি নানা কারণে চাঁদা তোলা হয়। এসব বাড়তি ব্যয় নির্বাহ করতে নিত্যকার পণ্যের ওপর মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। আজকাল লক্ষ করা গেছে, যে গ্রামে শাকসবজি, কলা, পেপে, আনারস, কচুর লতি, তরমুজ প্রচুর পরিমানে উৎপাদিত হচ্ছে সেখানকার নিকটবর্তী হাটে এসবের দাম শহরের তুলনায় অধিকতর। তার মূল কারণ, পণ্যগুলো সরাসরি হাটে বিক্রি করার সুযোগ না থাকা। যা একসময়ে অবাধে হাটে প্রবেশ করতে পারতো ও বিক্রির সুবিধা ছিল। জনসাধারণ স্বাধীনভাবে যাছাই বাছাই করে কিনতে পারতো। ফলশ্রুতিতে এখন গ্রামে গিয়ে নির্ভেজাল, প্রাকৃতিক, তরতাজা সবুজ কিছু ক্রয় করে খাওয়ার দিনও ফুরিয়ে গেছে। ঘুরে ফিরে সমগ্র দেশ, সমুদ্র থেকে পাহাড়, উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত কোনো একটা জনপদ চাঁদা তোলার নতুন নতুন উদ্ভাবনী কলাকৌশলের বাইরে যেতে পারছে না। মনে হয়, কেন্দ্র-প্রান্ত, উর্ধ্ব-অধো একাকার হয়ে সরবে, নিভৃতে চলছে একে অপরের কাছ থেকে  তোলা চাঁদার মহোৎসব। সমাজের অন্য সবকিছু সত্য বা অর্ধ সত্য হলেও চাঁদা আদায় শতভাগ সত্য। যেন চারদিকে চাঁদার জয়জয়কার, চাঁদাই শক্তি। 

৫.

দেশে নতুন সরকার এসেছে। তাকে অনেক কিছু নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। তবে গতানুগতিকতা দিয়ে গণমানুষের আস্হা, বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্টার লক্ষে গ্রাম এবং গ্রামীণ জনপদকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারের পরিবর্তন হলে জনগণও নড়েচড়ে বসে, এক আকাশ প্রত্যাশা বুকে লালন করে। একেবারে অভিনব, অভূতপূর্ব কিছুর আশা করে অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে সবকিছু যেন ধূসর বিবর্ণ আবছায়ায় পরিণত হয়। এদেশে দশকের পর দশক এটাই হয়ে আসছে। 

কাজেই দেশের স্হানীয় সরকার ব্যবস্হাকে আরও গতিশীল, জোরদার এবং কার্যকর করার বিকল্প নেই। ভালো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে এদের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এদের ওপর জাতীয় নেতৃত্বের সরাসরি খবরদারি থাকবে না। ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলাপরিষদে জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেও তাৎক্ষণিক আইনের শাসনের অধীন করতে হবে। দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে এসবের ওপর দৃষ্টিপাত খুবই জরুরি। তবেই পরিবর্তন সম্ভব অন্যথায় নয়।


হোসেন আবদুল মান্নান -- গল্পকার ও কলামলেখক।