ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের ছক: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম নতুন বিশ্বব্যবস্থা
বর্তমান পরিস্থিতির গভীরতা বোঝার জন্য কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নয়, তাকাতে হবে মস্কো ও বেইজিংয়ের দিকে। চীন ও রাশিয়া যখন তাদের নাগরিকদের ইসরায়েল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এটি আর কেবল আঞ্চলিক উত্তেজনা থাকে না- এটি বৈশ্বিক সংঘাতের স্পষ্ট ইঙ্গিত হয়ে ওঠে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ইরানের সঙ্গে আগের ১২ দিনের যুদ্ধে রাশিয়া এমন পদক্ষেপ নেয়নি। অর্থাৎ, এবার পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্ফোরক।
আরও পড়ুন: জিম্মি একটি জাতি: বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরাধ ও অযোগ্যতার ভয়াবহতা
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে- কেন এবার চীন ও রাশিয়া এতটা সতর্ক? কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গতিপথ আর কারও অজানা নয়। ভেনিজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের ব্যর্থ চেষ্টা, ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ- এরপর ইরান। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরান যদি পশ্চিমা বলয়ের কাছে পরাজিত হয়, তবে পরবর্তী টার্গেট তালিকায় রাশিয়া ও চীনের নাম আসবে- এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। সুতরাং ইরানকে সামনে রেখে পশ্চিমাদের আটকে রাখাই এখন তাদের কৌশলগত স্বার্থ।
ইরান আজ কার্যত একা লড়ছে। প্রায় পুরো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে আছে দেশটি। নিষেধাজ্ঞা, মিডিয়া যুদ্ধ, সামরিক হুমকি- সব একসাথে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এটিকে আর ‘নিরাপত্তা ইস্যু’ বলা চলে না; এটি একটি রাষ্ট্রকে নতজানু করানোর সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
আরও পড়ুন: শীতার্তদের সহযোগিতা দয়ার গল্প নয়, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যর্থতা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ন্যায়বিচারের কথা বলে, সেই ন্যায়ের মানদণ্ড কোথায়? আন্তর্জাতিক আইন কোথায়? ফিলিস্তিনে বছরের পর বছর গণহত্যা চললেও তারা নীরব, অথচ ইরান নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেষ্টা করলেই তাকে ‘হুমকি’ বানানো হয়। এই দ্বিচারিতাই বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট।
আরব বিশ্ব ও মুসলিম দেশগুলোর নিরবতা এই অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করেছে। কিছু রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের পদলেহন করে নিজেদের নিরাপত্তা কিনতে চেয়েছে- কিন্তু ইতিহাস বলে, এই নিরাপত্তা কখনো স্থায়ী হয় না। আজ ইরান, কাল অন্য কেউ।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের নেতৃত্বের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইরানের দৃঢ় অবস্থান শুধু একটি দেশের নয়- এটি একটি প্রতিরোধের প্রতীক। মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্বের সংকটের সময়ে এই দৃঢ়তা অনেকের কাছে সাহসের উৎস হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব এখন স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত- একদিকে আধিপত্যবাদী শক্তি, অন্যদিকে প্রতিরোধের বলয়। এই লড়াই শুধু ইরানের জন্য নয়; এটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্য।
প্রশ্ন একটাই- বিশ্ব কি আর একচেটিয়া শক্তির নির্দেশে চলবে, নাকি ন্যায় ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে নতুন ভারসাম্য তৈরি হবে?
ইতিহাস সাক্ষী- অত্যাচার দীর্ঘস্থায়ী হয় না। শক্তির দম্ভ যত বড় হয়, পতনও তত দ্রুত আসে।
ইরানকে ঘিরে আজ যে আগুন জ্বলছে, তা কেবল একটি দেশের নয়- এটি বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগুন।
লেখক: এম এফ ইসলাম মিলন, কলামিস্ট ও ব্যবসায়ী।





