অদম্য নারী: আফরোজা খানম রিতা

Sadek Ali
সোহেলী সুহি
প্রকাশিত: ১২:০৯ অপরাহ্ন, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৩:১১ অপরাহ্ন, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সোনার চামচ মুখে নিয়েই জন্ম তাঁর। আভিজাত্য, মান-মর্যাদা, জৌলুশ ও প্রাচুর্যের কোনো ঘাটতি ছিল না কখনোই। ব্যবসায়ী পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে জন্ম নেওয়া ধনাঢ্য পিতার আদরের কন্যা তিনি। কন্যার চোখে পিতা ছিলেন আদর্শের প্রতীক, আর কন্যাও নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন সেই আদর্শেই।

দক্ষিণ এশিয়ার একটি দরিদ্র দেশ ছেড়ে উন্নত দেশের বিলাসী জীবন যাপনের সুযোগ তাঁর সামনে নিঃসন্দেহে ছিল। কিন্তু সবকিছু প্রত্যাখ্যান করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাজপথ। আড়ম্বরপূর্ণ জীবন ত্যাগ করে সঙ্গী হয়েছেন সমাজের একেবারে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের। পার্থিব ভোগবিলাস ও প্রাচুর্যের হাতছানি উপেক্ষা করে গ্রহণ করেছেন সংগ্রামের পথ। যে সমাজে নারীদের এখনো দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়, সেই সমাজেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নারী নেতৃত্বের এক দৃঢ় ও অনন্য প্রতীক হিসেবে।

আরও পড়ুন: জ্ঞানহীনতা ভেঙে দিচ্ছে গণতান্ত্রিক রাজনীতি

বলছিলাম মানিকগঞ্জ–৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক আফরোজা খানম রিতা-র কথা। তিনি সাবেক মন্ত্রী মরহুম হারুনার রশিদ খান মুন্নু এবং মিসেস হুরুন নাহার রশিদের জ্যেষ্ঠ সন্তান। দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর।

১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণকারী আফরোজা খানম রিতা ২০০১ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা অতিক্রম করে ২০১৩ সালে তিনি মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। টানা ১৭ বছর আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে থেকে সক্রিয়ভাবে লড়াই করে গেছেন। মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছেন নেতাকর্মীদের। মানিকগঞ্জ বিএনপির সাংগঠনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রেখেছেন স্মরণীয় ভূমিকা। তারই স্বীকৃতি হিসেবে এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের বিপরীতে যে ৯ জন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম তিনি।

আরও পড়ুন: গণভোট ২০২৬: রাষ্ট্র যখন নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারক

আওয়ামী ফ্যাসিস্ট রেজিমের সময়ে যেখানে বিরোধী রাজনীতি করা ছিল জীবন নিয়ে খেলবার সমান, সেখানে নিজ দায়িত্বে সক্রিয় ছিলেন আফরোজা খানম রিতা। সেই বৈরী ও উত্তাল সময়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন মানিকগঞ্জ বিএনপিকে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এক বক্তব্যে বলেছেন, “দীর্ঘ সময় ধরে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করা যায়নি।”

এমন অনুর্বর সময়েও নিজের গুণ ও দক্ষতায় মানিকগঞ্জের অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রিতা।

ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনের পর নতুন বাংলাদেশ দেখার স্বপ্নে উদ্দীপ্ত ছিল পুরো দেশ—একটি বাংলাদেশ, যেখানে নারী-পুরুষে কোনো বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। একটি গোষ্ঠী এখনো নারীদের দমিয়ে রাখতে নানা কৌশলে তৎপর—কখনো পেশিশক্তি প্রয়োগ করে, কখনো হয়রানি ও মানসিক নিপীড়নের মাধ্যমে। তবুও এসব বাধা আফরোজা খানম রিতাকে দমাতে পারেনি। তিনি আপসহীনভাবেই এগিয়ে চলেছেন।

নারী ও যুব সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভাবনা সার্বক্ষণিক। এ লক্ষ্যেই তিনি চালু করেছেন “নারীই শক্তি” নামের একটি অ্যাপ, যেখানে নারীরা সরাসরি তাদের মতামত, সমস্যা ও প্রত্যাশা তুলে ধরতে পারবেন।

গরিব ও অসহায় রোগীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার উদ্যোগ নিলেও একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে নির্বাচন আচরণবিধির অজুহাতে তা বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি। সেবা বন্ধ হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিনিয়ত তাঁকে অশোভন মন্তব্য ও মানহানিকর কটূক্তি শুনতে হলেও অসীম ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশ্যে একবারের জন্যও কোনো অশালীন মন্তব্য করেননি।

এর ফলেই মানিকগঞ্জের তরুণ-তরুণী, সর্বস্তরের জনগণ, নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন তাঁর সাহসের প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন—নিজ মহিমায়, নিজ দৃঢ়তায়।