মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বার কাউন্সিল রিভিউতে উত্তীর্ণ ১৯১৪ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবীর পক্ষে খোলা চিঠি

Sanchoy Biswas
মোহাম্মদ ইউনুস মল্লিক
প্রকাশিত: ৪:১৫ অপরাহ্ন, ০৫ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৬:১০ অপরাহ্ন, ০৫ মার্চ ২০২৬

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান,

আপনি এই দেশের আশা, আস্থা ও প্রেরণার প্রতীক। আপনি কেবল একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক নন- আপনি একজন মানবিক, দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শী নেতা, যাঁর ভাবনাই হচ্ছে সর্বদা জনগণের কল্যাণে নিবেদিত থাকা। আমরা জানি, এই দেশের কোথাও অন্যায়, অবিচার বা মানবতার অবমাননা ঘটলে, আপনার হৃদয়ও তা অনুভব করে গভীরভাবে ব্যথিত হয়। সেই জায়গা থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে অবগত করতে চাই- বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইনজীবী তালিকাভুক্ত পরীক্ষার রিভিউতে উত্তীর্ণ ১৯১৪ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবী আজ অবিচারের শিকার। কারণ, ২০২৫ সালের আইনজীবী তালিকাভুক্তি লিখিত পরীক্ষার রিভিউ ফলাফল বাতিলের সিদ্ধান্ত আইন ও ন্যায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আপনার প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা রেখে দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাই বিনীতভাবে কয়েকটি কথা নিবেদন করছি।

আরও পড়ুন: দূরবর্তী যুদ্ধ, তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ভূমিকম্প

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি নিশ্চয় অবগত আছেন যে- বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার দেশের যে কয়টি প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত করেছিল তার ভেতরে অন্যতম ছিল বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। তারা দীর্ঘ ১৬ বছর প্রতিষ্ঠানটিতে কুক্ষিগত করে রাখলেও ৮টির বেশি এনরোলমেন্ট প্রসেস সম্পূর্ণ করতে পারে নি। তবে তাদের পতনের পর স্বায়ত্তশাসিত এই প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। দেশের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রথিতযশা সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে গঠিত অ্যাডহক কমিটি দায়িত্ব নিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দায়িত্বশীলতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়।  

তবে প্রতিষ্ঠানটিতে সংকট শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করার পর। যে ফলাফলে ৭,৯১৭ জন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ফল প্রকাশের পর অনেক পরীক্ষার্থীই দাবি করেন যে, তারা পরীক্ষায় পাস করার মতো ভালো পরীক্ষা দিয়েছেন কিন্তু প্রকাশিত ফলাফলে তাদের রোল নম্বর আসেনি। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ অক্টোবর বার কাউন্সিল একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে খাতা রিভিউয়ের আবেদন আহ্বান করে। নির্ধারিত বিধি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন গ্রহণ ও পর্যালোচনা শেষে ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও এনরোলমেন্ট কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে রিভিউ ফলাফল প্রকাশ করে। এই রিভিউ ফলাফলে ১৯১৪ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবীকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়। ফলে তারা পরবর্তী ধাপ ভাইভা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের একটি সুস্পষ্ট আইনসম্মত অধিকার এবং বৈধ প্রত্যাশা (Legitimate Expectation) অর্জন করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, রিভিউ ফলাফল প্রকাশের মাত্র কয়েক দিনের মাথায়, অতি সীমিতসংখ্যক ব্যক্তির আপত্তির প্রেক্ষিতে ২৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আরেকটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুরো রিভিউ ফলাফল বাতিল ঘোষণা করে বার কাউন্সিল।

আরও পড়ুন: নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

ফলাফল বাতিল করার প্রজ্ঞাপনে বার কাউন্সিল উল্লেখ করে যে, ‘রিভিউ আবেদনকারী প্রার্থীগণের মধ্যে যেসব অকৃতকার্য প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় ন্যূনতম ৪৭ নম্বর পেয়েছে তাদেরকে ৩ নম্বর গ্রেইস হিসেবে প্রদানপূর্বক বার কাউন্সিল পরীক্ষা-বিধি অনুযায়ী পাস মার্ক ন্যূনতম ৫০ বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদেরকে বিগত ১৮-১১-২০২৫ তারিখে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরও ঘোষণা করা হয়, ‘এনরোলমেন্ট কমিটি অদ্য ২৩-১১-২০২৫ তারিখের বিশেষ জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, বিগত ১৮-১১-২০২৫ তারিখে প্রকাশিত রিভিউ ফলাফল বাতিলপূর্বক রিভিউ আবেদনকারী প্রতিটি প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।’

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে- এ সিদ্ধান্ত স্পষ্টতই প্রশাসনিক ক্ষমতার অসামঞ্জস্যপূর্ণ (disproportionate) প্রয়োগের শামিল হিসেবে বিবেচিত। এই সংকট সমাধানের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উপায় হতে পারতো- প্রথম ধাপে রিভিউ উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের ফলাফল অক্ষুণ্ন রেখে বাকি পরীক্ষার্থীদের খাতাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে রিভিউ ফলাফল দ্রুত প্রকাশ করে ভাইভা নেওয়ার মাধ্যমে চলতি এনরোলমেন্ট প্রসেস শেষ করা। কেনো না, বার কাউন্সিল পূর্বে বিভিন্ন পরীক্ষায় গ্রেইস দিয়ে অধিকসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে পাস করালেও গ্রেইস দেওয়ার কারণে কখনো ফলাফল বাতিল করেনি। তবে এইক্ষেত্রে যেহেতু একটা সংকট তৈরি হয়েছে তাই তারা যাদেরকে পাস দেখিয়েছে তাদের ফলাফল অক্ষুণ্ন রেখে বাকী খাতাগুলো মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারতো। তাছাড়া যেহেতু রিভিউ প্রক্রিয়া, মূল্যায়ন ও ফলাফল প্রকাশ সবই বার কাউন্সিলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে। তবে তারা সেই সিদ্ধান্তের দায় স্বীকার না করে হঠাৎ করে ফলাফল বাতিল করায় প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর একটি বড় প্রশ্ন উঠে গেছে। 

সংকটময় এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ১৯১৪ জন রিভিউ উত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবী মাননীয় সংসদ সদস্য এবং বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও এনরোলমেন্ট কমিটির সদস্য, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, বার কাউন্সিলের তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানসহ বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করেন। এই সময়ে তাদের বেশিরভাগই তাদের নিশ্চিত করেছেন যে- রিভিউ উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের ফলাফল বহাল রেখে অবশিষ্ট খাতাগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রকাশ করা হবে। 

তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে, সম্প্রতি বার কাউন্সিল নতুন করে রিভিউয়ের রেজাল্ট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু করায়। বার কাউন্সিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে- রিভিউ উত্তীর্ণ ১৯১৪ জনের ভেতরে বড় অংশটিকে বাদ দিয়ে এনরোলমেন্ট কমিটি নতুন করে রিভিউয়ের ফলাফল প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। বার কাউন্সিলের বর্তমান কমিটির সদস্যরাও যে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে রিভিউ উত্তীর্ণদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। রিভিউ উত্তীর্ণদের মতো তাদেরও চাওয়া হচ্ছে- যেহেতু ১৯১৪ জনকে বার কাউন্সিল বিধি মোতাবেক একবার উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে তাই তাদের ফলাফল বহাল রেখে নতুন করে খাতা মূল্যায়নে যারা পাস করেছে তাদের রোলগুলো অন্তর্ভুক্ত করে একটা গ্রহণযোগ্য ফলাফল প্রকাশ করা। না হলে সামাজিক ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশংকা করছেন তারা। তাছাড়া বার কাউন্সিলকে বিতর্কমুক্ত রাখতেও এর ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ নেই।    

এর কারণ হচ্ছে- নভেম্বরের ১৮ তারিখে প্রথমবার রিভিউ ফলাফল প্রকাশের পর উত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীদের অবহিত করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ করেছেন। আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীরা তাদের এই সফলতা উদযাপন করেছেন। তাই ফলাফল বাতিল হওয়ায় তারা সামাজিকভাবে একবার হেয় প্রতিপন্ন হয়েছেন এবং মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। এখন যদি নতুন প্রকাশিত ফলাফলে তাদের উত্তীর্ণ না দেখানো হয় তাহলে তাদের- তাহলে তারা চরমভাবে বিপর্যস্ত হবেন সমাজে। যা অনেককে আত্মহননের পথে নিয়ে যেতে পারে বলেও শঙ্কা রয়েছে। 

তাছাড়া সাধারণ মানুষকে বার কাউন্সিলের প্রতি নেতিবাচক ধারণা দিতে পারে ব্যাপারটি যা নিশ্চিতভাবেই পেশার সুনাম ক্ষুণ্ন করবে। ফলে ব্যাপারটি এমন অবস্থায় চলে গেছে যে, এটি আর নিছক একটি পরীক্ষার ফলাফল সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি হাজারো শিক্ষানবিশ আইনজীবীর জীবন, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে ঘিরে একটি গভীর মানবিক ও আইনগত সংকটেও রূপান্তরিত হয়েছে।  

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রথমবারের রিভিউ রেজাল্টে সর্বোচ্চ ৩ নম্বর গ্রেইস দিয়ে ১৯১৪ জনকে পাস দেখানো হয়েছে- এমন তথ্য জানিয়েছে এনরোলমেন্ট কমিটি। কিন্তু কথা হলো - যাদের গ্রেইস দিয়ে উত্তীর্ণ করা হয়েছিল তারা কী এনরোলমেন্ট কমিটির কাছে আবেদন করেছিলো গ্রেইস দিয়ে তাদের পাস না করানোর জন্য? যদি না করে থাকে তাহলে এনরোলমেন্ট কমিটির এই সিদ্ধান্তের জন্য তারা কেনো ভুক্তভোগী হবে? আর এটা তো এমন তো নয় যে- বার কাউন্সিল এবারই প্রথম গ্রেইস দিয়েছে। খবর নিয়ে জানা গেছে- অতীতে আইনজীবী নিবন্ধনের প্রায় প্রতিটি পরীক্ষাতেই বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরীক্ষার্থীদের বার কাউন্সিল গ্রেইস দিয়ে উত্তীর্ণ করিয়েছে। ২০২১ সালে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়া ব্যাচটিতে বার কাউন্সিলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গ্রেইস দেওয়ার কথাও জানা যায়। সেবার প্রশ্নপ্রত্রের নতুন ধরণে পরীক্ষা হওয়ায় সবচেয়ে বেশি নম্বর গ্রেইস দিয়ে পাস করানো হয়। বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটির বিগত সময়ের নথিপত্রগুলো তলব করলেই আপনি এর সত্যতা পেয়ে যাবেন।  

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এমন পরিস্থিতিতে আপনার কাছে বিনীত প্রার্থনা, বার কাউন্সিল এবং  রিভিউ উত্তীর্ণ ১৯১৪ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবীর মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে- প্রথম ধাপে রিভিউ উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের ফলাফল অক্ষুণ্ন রেখে বাকি পরীক্ষার্থীদের খাতাগুলো পুনর্মূল্যায়নে যারা পাস করেছে তাদের রোল নম্বরগুলো অন্তর্ভুক্ত করে রিভিউ ফলাফল প্রকাশে মানবিক পদক্ষেপ নেবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রিভিউ উত্তীর্ণ ১৯১৪ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবীর শেষ আস্থা এবং ভরসার জায়গা আপনি। তাই আজ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার নিকট আমার বিনীত আরজি- আপনি বার কাউন্সিলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ন্যায়নিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। আপনার প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ ও মানবিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সারা দেশের মতো বার কাউন্সিলও আবার সুবিচার এবং ন্যায়ের মডেল হিসেবে উদ্ভাসিত হোক- আমাদের প্রার্থনা এটাই।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, মল্লিক ল’ একাডেমী