কোরবানির চামড়া: সম্ভাবনার সম্পদ নাকি অব্যবস্থাপনার শিকার?
পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের ত্যাগ, মানবতা ও সামাজিক সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। এই ঈদে কোরবানির পশুর চামড়া শুধু একটি ধর্মীয় আনুষঙ্গিক বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি শিল্প, কর্মসংস্থান এবং এতিম-মাদ্রাসাভিত্তিক সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। অথচ প্রতি বছর অব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সংকট, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং বাজার অস্থিরতার কারণে কোটি কোটি টাকার সম্ভাবনাময় এই খাত ক্ষতির মুখে পড়ে।এবার সরকার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বৃদ্ধি করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঢাকার ভেতরে গরুর চামড়ার মূল্য প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা এবং বকরির চামড়া ২০ থেকে ২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের এই মূল্য নির্ধারণ মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও সাধারণ সংগ্রাহকদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও বাস্তব বাজারে এর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।বাংলাদেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত। কোরবানির ঈদে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া দেশের ট্যানারি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ শিল্পকে ঘিরে হাজার হাজার শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও রপ্তানিকারক তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা মানে শুধু ব্যবসা রক্ষা নয়; বরং একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক চক্রকে সচল রাখা।প্রতি বছর দেখা যায়, যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। মূলত সময়মতো লবণ না লাগানো, সঠিকভাবে পরিষ্কার না করা এবং পরিবহনে বিলম্বের কারণেই এই ক্ষতি ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশু জবাইয়ের পর যত দ্রুত সম্ভব চামড়া আলাদা করে রক্ত, মাংস ও চর্বি পরিষ্কার করে পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার করলে চামড়ার গুণগত মান বজায় থাকে এবং ভালো দাম পাওয়া সম্ভব হয়। তাই কোরবানিদাতা থেকে শুরু করে মৌসুমি ব্যবসায়ী- সবার মাঝে সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।এ বছর সরকার চামড়া পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি মাদ্রাসা ও স্থানীয় সংগ্রাহকদের হয়রানি বন্ধ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু নির্দেশনা নয়, মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- চামড়াকে আমরা যেন “বর্জ্য” নয়, “সম্পদ” হিসেবে বিবেচনা করি। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ট্যানারি শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক চামড়া বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদেরও চামড়াভিত্তিক পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করতে হবে। কারণ কাঁচা চামড়া রপ্তানির চেয়ে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বহুগুণ বেশি লাভজনক।কোরবানির চামড়া নিয়ে প্রতিবছরের বিশৃঙ্খলা ও হতাশা দূর করতে হলে সরকার, ব্যবসায়ী, ট্যানারি মালিক, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ জনগণ- সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই এই খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে এবং কোরবানির প্রকৃত কল্যাণ সমাজের বৃহত্তর অংশে পৌঁছে যাবে।
লেখক: এম এফ ইসলাম মিলন, উদ্যোক্তা ও কলামিস্ট।





