সমৃদ্ধির স্বপ্নে স্থবিরতা: বাংলাদেশের অর্থনীত
ভূমিকা: এক সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের অর্থনীতি
বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কর্মঠ জনশক্তি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং অসাধারণ উদ্যোক্তা-মানসিকতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্ববর্তী গতি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে? কেন সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপে জর্জরিত, ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির মুখোমুখি, বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না?
আরও পড়ুন: এলপিজি বাজারে স্থিতিশীলতা: প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
এসব প্রশ্নের গভীর বিশ্লেষণ ও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের সংকট মানবসম্পদ কিংবা অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব নয়। বরং কাঠামোগত দুর্বলতা, আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থা, সুশাসনের ঘাটতি এবং নীতিগত ব্যর্থতার সম্মিলিত প্রভাবে দেশের উৎপাদনক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক স্থবিরতা বলতে সব সময় অর্থনীতির সম্পূর্ণ প্রবৃদ্ধিহীনতাকে বোঝায় না। প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ দুর্বল থাকা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির অপর্যাপ্ততা এবং উন্নয়নের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়াও অর্থনৈতিক স্থবিরতার লক্ষণ।
আরও পড়ুন: ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’
এই লেখার পূর্ববর্তী সংস্করণে বিশ্বব্যাংকের নামে ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের একটি Bangladesh Development Update এবং ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে ৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময় ২০২৫ সালের মার্চ; ফলে ৬ অক্টোবর ২০২৬-এর কোনো প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হওয়ার কথা নয়। অতএব, ওই তারিখ, প্রতিবেদন, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস, দারিদ্র্য, খেলাপি ঋণ এবং রাজস্বসংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে বর্তমান প্রকাশ্য উৎসের ভিত্তিতে যাচাই করা সম্ভব নয়। যাচাই না হওয়া তথ্যকে বিশ্বব্যাংকের উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত বাংলাদেশ-সংক্রান্ত অর্থনৈতিক পূর্বাভাস, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও ব্যাংকিং খাতের তথ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব তথ্য—এসব পৃথক উৎসে প্রকাশিত হয় এবং তাদের সংজ্ঞা, সময়কাল ও হিসাবপদ্ধতিও এক নয়। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট উৎসের সর্বশেষ সংস্করণ, প্রকাশের তারিখ এবং পরিসংখ্যানের সময়কাল উল্লেখ করা আবশ্যক।
অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রধান কারণসমূহ
১. সুশাসনের ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা
অর্থনৈতিক স্থবিরতার অন্যতম মৌলিক কারণ হলো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যর্থতা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কেবল উচ্চাভিলাষী প্রকল্প, বাজেট বরাদ্দ কিংবা দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, নিরপেক্ষ প্রশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং জনসাধারণের আস্থা।
ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত যখন বাণিজ্যিক যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সম্পদ উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড থেকে সরে গিয়ে অনৈতিক সুবিধা অর্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যবহৃত হয়। সরকারি ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব থাকলে প্রকল্পের ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায় এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল কমে আসে। একইভাবে, নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করতে কিংবা মূলধন অন্যত্র সরিয়ে নিতে উৎসাহিত করে।
অতএব, মূল সমস্যা শুধু নীতিমালার প্রাপ্যতা নয়; বরং নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা যখন ধারাবাহিকভাবে উৎপাদনশীল উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করে, তখন কোনো অর্থনীতির পক্ষেই টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়।
১. ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব
একটি আধুনিক অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো সুস্থ ও কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ব্যাংক জনগণের সঞ্চয় সংগ্রহ করে, শিল্প সম্প্রসারণে অর্থায়ন করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে সহায়তা দেয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে গতিশীল রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থিক খাত খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, অপর্যাপ্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণের অদক্ষ বণ্টনের মতো গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি।
পূর্ববর্তী সংস্করণে দাবি করা হয়েছিল যে ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার ৩৩.২ শতাংশে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৩০.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। এই তথ্য যাচাইযোগ্য নয়, কারণ ২০২৬ সালের জুন এখনো ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করতে হলে প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট তারিখ, শ্রেণিবিন্যাসের সংজ্ঞা এবং মোট ঋণের ভিত্তি উল্লেখ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে; তবে এখানে যাচাই না করা ভবিষ্যৎ সংখ্যা ব্যবহার করা হলো না।
প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা যখন বিশেষ সুবিধা পান, ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবর্তে অন্যত্র ব্যবহৃত হয় কিংবা ঋণ পরিশোধের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, তখন সৎ ও দায়িত্বশীল উদ্যোক্তারা অর্থায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলে ব্যাংকগুলো নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনে সহায়তা করার সক্ষমতা হারায়।
এ সংকটের সমাধান দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বিচারে অর্থ সহায়তা দেওয়া নয়। বরং প্রয়োজন স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পদমান মূল্যায়ন, আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় খেলাপি ঋণ আদায়, আর্থিক অনিয়মের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন।
১. দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার অবক্ষয়
মূল্যস্ফীতি মানুষের অর্থনৈতিক কল্যাণের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক হুমকিগুলোর একটি। খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে পরিবারের প্রকৃত আয় কমে যায়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট বেতনভোগী এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয় সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে না বাড়লে পরিবারগুলো ভোগব্যয় কমাতে বাধ্য হয়, প্রয়োজনীয় ব্যয় স্থগিত করে এবং সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাপন করে। এর ফলে পণ্য ও সেবার চাহিদা কমে যায়, যা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
মূল্যস্ফীতি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয় এবং দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল করে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম এবং বিনিময় হারের পরিবর্তন মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রাখলেও দেশীয় সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতা, বাজারের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করে মূল্যস্ফীতির সব উৎস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর মুদ্রানীতির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, উন্নত পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা।
১. বেসরকারি বিনিয়োগে দুর্বলতা ও প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ
উৎপাদন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। কিন্তু উদ্যোক্তাদের এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে তাদের বিনিয়োগ আইনের সুরক্ষা পাবে, নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান ন্যায্যভাবে প্রয়োগ হবে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্ভরযোগ্য থাকবে।
উচ্চ সুদের হার, অনিশ্চিত করব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব, জটিল লাইসেন্স প্রক্রিয়া, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্তির সমস্যাগুলো বিনিয়োগে নিরুৎসাহ সৃষ্টি করতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, কারণ তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কম।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা, মুনাফা ও মূলধন প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা, অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা এবং সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা মূল্যায়ন করেন। শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তার ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব নয়।
১. সীমিত রপ্তানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প রপ্তানি বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং নারীর কর্মসংস্থানে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সীমিতসংখ্যক পণ্য ও বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
ওষুধশিল্প, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী সামুদ্রিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে রপ্তানি সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে ক্রমশ প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠা আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত শর্তাবলি এবং স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের ফলে কিছু বাণিজ্যসুবিধা হারানোর সম্ভাবনার জন্য বাংলাদেশের শিল্প খাতকে প্রস্তুত করতে হবে।
১. জ্বালানি সংকট ও অপর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ
শিল্প উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অপরিহার্য। গ্যাসের ঘাটতি, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন এবং আমদানি করা জ্বালানির উচ্চমূল্য উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল করে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সীমিত রাজস্ব আহরণ অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পূর্ববর্তী সংস্করণে বিশ্বব্যাংকের নামে ২০২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ জিডিপির ৮.৩ শতাংশ বলা হয়েছিল। এই দাবি যাচাইযোগ্য নয়, কারণ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন ও সময়কাল ভবিষ্যৎ। রাজস্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের বাজেট নথি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদায় প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার ডেটাবেসে ব্যবহৃত সংজ্ঞা আলাদা হতে পারে। তাই উৎস ও হিসাবপদ্ধতি উল্লেখ না করে নির্দিষ্ট অনুপাত ব্যবহার করা উচিত নয়।
শুধু ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে একটি অর্থনীতির উন্নয়ন-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য করের আওতা বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি কমাতে হবে, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং সরকারি ব্যয়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা
তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলোর বাইরে আরও কয়েকটি গভীর কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা বাংলাদেশের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
প্রথমত, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নিয়ন্ত্রক বিধিবিধানের কঠোরতা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, চুক্তি বাস্তবায়ন ও বিরোধ নিষ্পত্তির দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করে। তৃতীয়ত, কারিগরি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা শ্রমবাজারের চাহিদা এবং কর্মীদের দক্ষতার মধ্যে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে।
চতুর্থত, গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং শিল্প উৎপাদনশীলতার অপর্যাপ্ততা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়। পঞ্চমত, কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাবে অদক্ষ মধ্যস্বত্বভোগী এবং বাজারের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন ভোক্তাদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়।
সর্বোপরি, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সরকারি নীতির ধারাবাহিকতার অভাব দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল পেতে অনেক সময় কয়েক বছর লেগে যায়। মৌলিক অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য না থাকলে পরবর্তী সরকারগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ পরিত্যাগ করতে পারে অথবা সংস্কার কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হতে পারে।
এই প্রতিবন্ধকতাগুলো পরস্পরকে শক্তিশালী করে। দুর্বল প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং শৃঙ্খলা নষ্ট করে; আর্থিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ কমায়; বিনিয়োগের অভাব কর্মসংস্থান সীমিত করে; আর কর্মসংস্থানের দুর্বল প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য ও সামাজিক অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতিতে স্থবিরতার পরিণতি
অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রভাব জাতীয় আয়ের পরিসংখ্যানের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত হয়।
প্রথমত, পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার পেছনে ব্যয় হয়।
দ্বিতীয়ত, বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব ও অপ্রতুল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। প্রতিবছর বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মপ্রত্যাশী প্রবেশ করেন। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলে একটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম প্রজন্মের সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।
তৃতীয়ত, ব্যবসায়িক আস্থা হ্রাস পায়। উদ্যোক্তারা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত করেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ প্রদানে আরও সতর্ক হয়ে ওঠে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য অধিক মুনাফা প্রত্যাশা করেন।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ে। উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিকরা মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে নিজেদের সম্পদ কিছুটা সুরক্ষিত রাখতে পারেন। অন্যদিকে, বেতনভোগী ও আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার মান ক্রমশ অবনতি ঘটে।
পঞ্চমত, সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। অপর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ, অর্থায়নের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং অদক্ষ ব্যয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য বরাদ্দযোগ্য অর্থ কমিয়ে দেয়।
পরিশেষে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করতে পারে এবং সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থনৈতিক দুর্দশা অবধারিতভাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে না; তবে দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য, বেকারত্ব এবং অবিচারের অনুভূতি সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
করণীয়: একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কৌশল
বাংলাদেশের জন্য বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক পদক্ষেপের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক ও উৎপাদনশীল খাতের সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।
প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক সততা ও জবাবদিহি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি ক্রয়, করব্যবস্থা, লাইসেন্স প্রদান এবং নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব নির্বিশেষে দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সম্পত্তির অধিকার রক্ষা, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে দৃঢ় ও কার্যকর সংস্কার আনতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য সম্পদমান মূল্যায়ন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার, করপোরেট সুশাসনের উন্নয়ন এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় খেলাপি ঋণ আদায় নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সাময়িক সমস্যায় থাকা কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে টেকসই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সুযোগ দিতে হবে। সরকারি অর্থ যেন স্থায়ীভাবে জবাবদিহির বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে হবে। মূল্যস্থিতি বজায় রাখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হবে। খাদ্য বিতরণব্যবস্থা, বাজার প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা উন্নত করার উদ্যোগ নিতে হবে। উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠীকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেয়—এমন অপরিকল্পিত ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা সম্প্রসারণ করা অধিক কার্যকর।
চতুর্থত, বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। ব্যবসা নিবন্ধন, কর প্রদান এবং লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার কমানো এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, ডিজিটাল সেবা এবং রপ্তানি সহায়তা আরও সহজলভ্য করতে হবে।
পঞ্চমত, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, সরবরাহব্যবস্থা এবং লক্ষ্যভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে প্রতিযোগিতামূলক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। উচ্চমূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন, ডিজিটাল সেবা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সামুদ্রিক শিল্পের বিকাশে উৎসাহ দিতে হবে। সরকারি প্রণোদনা হতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং অর্জিত ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ষষ্ঠত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি খাতের সুশাসন উন্নত করা, প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক অপচয় কমানো, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। জ্বালানি চুক্তি ও ক্রয়প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়বদ্ধতা সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
সপ্তমত, করব্যবস্থা ও সরকারি ব্যয়ের সংস্কার করতে হবে। করের আওতা বাড়ানো, ডিজিটাল কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং অযৌক্তিক কর অব্যাহতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। সরকারি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে অর্থনৈতিক মুনাফা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুফলের ভিত্তিতে—শুধু রাজনৈতিক দৃশ্যমানতার ভিত্তিতে নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষাকে উন্নয়নের অপরিহার্য অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
অষ্টমত, মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সহায়তা দিতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সহজলভ্য শিশুযত্ন সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে দেশের উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
নবমত, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। সরকার, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, শ্রমিক সংগঠন, পেশাজীবী এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসনিক পরিবর্তন হলেও মৌলিক অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। তবে সেই নীতিগুলো স্বচ্ছ পর্যালোচনা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের আওতায় থাকবে।
জিডিপির প্রবৃদ্ধির বাইরেও উন্নয়নকে মূল্যায়ন করতে হবে
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশটির চ্যালেঞ্জগুলো গুরুতর, কিন্তু অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল কর্মক্ষম জনশক্তি, উদ্যোক্তা-মনস্ক জনগোষ্ঠী, উল্লেখযোগ্য প্রবাসী আয় ও প্রবাসী দক্ষতা, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং উৎপাদন, সেবা, কৃষি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে বিপুল সম্ভাবনা।
এখন প্রয়োজন এমন একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন, যেখানে উন্নয়নকে কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, বরং উৎপাদনশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা, কর্মসংস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।
কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো অমীমাংসিত রেখে শুধু ঋণ বাড়িয়ে, নতুন প্রকল্প ঘোষণা করে কিংবা সাময়িক আর্থিক সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। অর্থনীতি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই সমৃদ্ধিও অর্জন করা যাবে না।
উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা হলো, একটি অর্থনীতি কাগজে-কলমে কতটা উৎপাদন করছে, তা নয়; বরং সাধারণ মানুষ সম্মানজনক কর্মসংস্থান পাচ্ছে কি না, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছে কি না, মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে কি না এবং মর্যাদার সঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ লাভ করছে কি না।
বাংলাদেশের শুধু দ্রুততর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন নয়; প্রয়োজন সুশাসননির্ভর, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এবং উন্নয়নের সুফল ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টনকারী প্রবৃদ্ধি। অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান উন্নতিতে রূপান্তর করার এখনই সময়।
এই রূপান্তরের সাফল্যই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ টেকসই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে, নাকি অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও অপূর্ণ সম্ভাবনার চক্রে আবদ্ধ থাকবে।





