ভেজাল খাদ্যের দাপটে জনস্বাস্থ্য চরম হুমকিতে
# বছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে
# দেশের ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না
আরও পড়ুন: হঠাৎ পোশাক শ্রমিকদের রাস্তায় নামানোর উস্কানিদাতা কারা
# দেশের ১০ শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টির শিকার
# খাদ্যসংকটে থাকা ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ
আরও পড়ুন: বায়ুদূষণে বাড়ছে উদ্বেগ, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল
# খাবারের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষের মৃতু
খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম, খাদ্য ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। কিন্তু পচা, বাসি, ভেজাল বা বিষাক্ত দ্রব্য মানুষের খাদ্য হতে পারে না। এটা মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমান বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হচ্ছে খাদ্যে ভেজাল। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকা চাল, ডাল, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে ফলমূল ও শিশুখাদ্য—কোনো কিছুই আজ পুরোপুরি নিরাপদ নয়। অসাধু ব্যবসায়ী এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র অতি অল্প সময়ে বিপুল অর্থ উপার্জনের আশায় খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশায়। ফল দ্রুত পাকাতে কার্বাইড, পচন রোধে ফরমালিন, এবং আকর্ষণীয় রঙ করতে কাপড়ের বিষাক্ত রং ও ইউরিয়া সারের ব্যবহার এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবো) গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ভেজাল খাবারের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ ক্যানসারে, ২ লক্ষ মানুষ কিডনি রোগে এবং দেড় লক্ষ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। এছাড়া হেপাটাইটিস, লিভার ও ফুসফুসের সংক্রমণ বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিরাপদহীন খাবারের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৪ লক্ষ ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ১ লক্ষ ২৫ হাজারই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, এখনো প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ আয়োডিনবিহীন লবণ খাচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন মসলা, পানীয় ও খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। এটি কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং একটি পুরো প্রজন্মের স্বাস্থ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো নীরব মহামারি। নিত্যনতুন পন্থায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর এই মহোৎসব সাধারণ মানুষের আসল খাদ্য চেনার পথকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা বছরব্যাপী মোবাইল কোর্ট অভিযান, জরিমানা, প্রতিষ্ঠান সিলগালা করেও কূলকিনারা পাচ্ছে না। উল্টো আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে ভেজালকারী প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, আর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ধুঁকছে পুরো জাতি। খাদ্যে ভেজালের লাগাম টানতে মাঠে কাজ করছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। কিন্তু তাদের একের পর এক অভিযানের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নেই।
দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও এ মুহূর্তে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ নিয়ে অনেক আইন হয়েছে, অনেকগুলো সরকারি সংস্থা কাজ করছে, কিন্তু এরপরও ভেজাল রোধ করা যাচ্ছে না। খাদ্য নিরাপদতা বলতে বোঝায়, খাদ্য যেন মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর না হয় এবং প্রত্যাশিত ব্যবহার অনুযায়ী তা বিশুদ্ধ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত থাকে। পর্যাপ্ত খাদ্য থাকলেও যদি তা ভেজাল, দূষিত বা পুষ্টিমানে ঘাটতিপূর্ণ হয়, তবে তা খাদ্য অধিকার পূরণ করে না।
তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে আছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক খাদ্যসংকট নিয়ে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫’এ এই তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থা মিলে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলো হলো এফএও, ইফাদ, ডব্লিউএফপি, ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দেওয়া ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক পৃথক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। দুই প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু খাদ্যনিরাপত্তার সংকটেই নয়, স্বাস্থ্যকর বা সুষম খাদ্য গ্রহণের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। এ বিষয়ে গত সাত বছরে অনেকটা উন্নতি হলেও এখনো দেশের ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না। দেশের ১০ শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টির শিকার। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) মোট ৯৩৭টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছে। এ সময় ৯ হাজার ৯৮৫টি খাদ্য প্রতিষ্ঠান মনিটরিং বা পর্যবেক্ষণ করা হয়। মাসভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, আগস্ট মাসে সর্বোচ্চ ৩২৯টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অন্যদিকে, মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৮৭৮টি খাদ্য প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়। আটটি বিভাগীয় শহরে আটটি মোবাইল ল্যাবরেটরি চালু করায় খাদ্য নিরাপত্তার পর্যবেক্ষণ জোরদার হয়েছে। ফলে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ প্রতিরোধে নতুন গতি এসেছে দাবি করলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ভেজাল কারবারিরা এখন আগের চেয়ে আরো বেপরোয়া হয়েছে। তারা ভেজাল মিশ্রণে নিত্য নতুন কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল মতি বলেন,‘খাদ্যে ভেজাল দেওয়া আর মানুষকে সরাসরি বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা একই কথা। বাজারে যেসব ক্ষতিকর রাসায়নিক, টেক্সটাইল রং ও প্রিজারভেটিভ খাবারে মেশানো হচ্ছে, তা মানবদেহের জন্য একেকটি ‘ স্লো পয়জন’ বা নীরব ঘাতক। এর ফলে দেশে ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল হওয়া এবং হৃদরোগের মতো মারাত্মক অসংক্রামক রোগ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। গর্ভবতী মায়েরা এই দূষিত খাবার খেলে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে। চিকিৎসকরা হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন যে মৃত্যুর মিছিল দেখছেন, তার একটি বড় কারণ এই অনিরাপদ খাদ্য। ভেজালকারীদের কঠোরতম শাস্তি না দিলে এই জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব।’
ভেজাল খাদ্যের কারণে জনস্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয় তা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর যেমন চাপ পড়ে তেমনি অসংখ্য পরিবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। হেটেলগুলোতে এখন নানা ধরনের কেমিক্যালের পাশাপাশি মোবিল ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ভেজাল ও মারাত্মক ক্ষতিকর খাদ্য প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে জনস্বাস্থ্যের জন্য তা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। ভেজাল বিরোধী কার্যক্রম ও অভিযানের কথা গণমাধ্যমে উঠে আসলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই আইনের ৭৫ ধারা অনুযায়ী, এ আইনের আওতায় করা অপরাধের বিচারের জন্য মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর অধীন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে। যাতে জরুরি কোনো পরিস্থিতি দ্রুততার সঙ্গে সামলানো যায়। এটি স্পষ্ট যে এই ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবস্থা সাময়িক। এটি অস্থায়ী, এর এখতিয়ার সীমাবদ্ধ এবং তাও বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য। এতে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে কারাদণ্ড প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কিন্তু ‘প্রশাসনিক জরিমানা’ আরোপের ক্ষমতা দিয়েছে, যার সীমা অনধিক তিন লাখ টাকা পর্যন্ত (ধারা ৭৮)। কেউ জরিমানা পরিশোধ না করলে সেজন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কাউকে কারাদণ্ড বা অন্য কোনো দণ্ড আরোপের ক্ষমতা রাখে না। সে ক্ষেত্রে সরকারি দাবি আদায় আইন-১৯১৩ অনুসারে সরকারি দাবি গণ্যে সেটি আদায়যোগ্য বিবেচিত হয়। দেখা যাচ্ছে, এ আইনের আওতায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করার পরিবর্তে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ শুধু প্রশাসনিক জরিমানা আদায়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে ভেজাল খাদ্য উৎপাদক ও সরবরাহকারীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে জনগণকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে ফরমালিন ও কারবাইডের মতো বিষাক্ত দ্রব্য খাবারে না মেশায়। এ জন্য প্রচলিত আইন আরও কঠোর করে যথাযথ প্রয়োগ এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।





