শুরু হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, দুদকের সার্চ কমিটি চূড়ান্ত

Sanchoy Biswas
মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব
প্রকাশিত: ৪:৪৬ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৯:৪৮ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বেশ কিছুদিন স্থবিরতার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠনে সরকারের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনেই দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের সার্চ কমিটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের পরই দেশজুড়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সার্চ কমিটির প্রধান ও সদস্যদের নাম পাঠানো হচ্ছে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। যাচাই-বাছাই করে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে কমিটি নির্বাচন করলেই প্রজ্ঞাপন জারি করবে সরকার।

আরও পড়ুন: রামিসা হত্যার তদন্ত সংশ্লিষ্টসহ ভালো কাজের পুলিশকে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধান বিচারপতি দেশের বাইরে অবস্থানের কারণেই সার্চ কমিটি গঠন বিলম্বিত হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধান বিচারপতিকে গত মাসেই চিঠি দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠনে সার্চ কমিটি গঠনের জন্য আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি ও প্রধান বিচারপতির অভিপ্রায় অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতির নাম দেওয়ার জন্য। চিঠির উত্তর বিলম্বিত হয়েছে প্রধান বিচারপতি বিদেশে অবস্থানের কারণে।

সূত্র জানায়, প্রধান বিচারপতির দপ্তর থেকে আপিল বিভাগের একজন ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতির নাম পাঠানো হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। সার্চ কমিটি গঠনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কার্যক্রম চূড়ান্ত করেছে।

আরও পড়ুন: পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপিদের র‍্যাঙ্ক ব্যাচ প্রদান

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হচ্ছে ২০০৪ সালের বিদ্যমান আইনেই। দুর্নীতি দমন কমিশন-সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে পাস না হওয়ায় দুদক গঠনেও বিলম্ব হয়েছে।

এদিকে নতুন সরকারের সময় থেকে দুদকে কমিশন না থাকায় কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।

নতুন মামলা, অভিযোগপত্র অনুমোদন দেওয়া যাচ্ছে না

নতুন মামলা, অনুসন্ধান, অভিযোগপত্র অনুমোদন, আসামিকে বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, সম্পদ ক্রোকসহ কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত সব কাজই এখন বন্ধ। শুধু চলছে প্রশাসনিক রুটিন কার্যক্রম। এ কারণে দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে একরকম স্থবিরতা নেমে এসেছে।

২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুদকের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে জনআস্থার সংকট রয়েছে। তবে কমিশন ছাড়া দুদক এত দীর্ঘ সময় আগে কখনও ছিল না।

নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নির্বাচনের আগে-পরে বিভিন্ন আলোচনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাবের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা ও কমিশন গঠনের জন্য প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। সিআইডির চেয়ারম্যান ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করে আলোচনা করেছেন।

দুর্নীতিবিরোধী আস্থাশীল একটি কমিশন গঠনের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ১০ জন ব্যক্তির প্যানেল তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। চেয়ারম্যানের বিষয়টি চূড়ান্ত না হলেও অবসরপ্রাপ্ত একজন আলোচিত বিচারককে কমিশনার (তদন্ত) এবং একজন সাবেক আইজিপিকে কমিশনার (অনুসন্ধান) নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত বলে জানা গেছে। নতুন প্রজন্মের দক্ষ একজনকে চেয়ারম্যান করার আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করার পর দুদক নেতৃত্বশূন্য হয়। দুদকের ছয়টি অনুবিভাগে দুই হাজারের বেশি অভিযোগ অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা মামলার সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছেন। কমিশন না থাকায় অভিযোগগুলোর বিপরীতে মামলার অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অচলাবস্থা চলছে।

তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুদকের ‘কমিশন’ গঠনের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে তোড়জোড় চলছে। সার্চ কমিটি গঠন করে দুদকের আগের আইনেই কমিশন গঠন করা হবে।

দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী, আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হচ্ছে।

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটি যোগ্যতাসম্পন্ন দুদকের নতুন তিন কমিশনার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে ছয় ব্যক্তির নাম পাঠাবে। পরে রাষ্ট্রপতি ছয়জনের মধ্য থেকে তিনজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন। এই তিনজনের মধ্যে একজনকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হবে।

কার্যক্রম স্থবির

কমিশন না থাকায় গত ৩ মার্চের পর থেকে নতুন কোনো মামলা বা অভিযোগপত্রের অনুমোদন হয়নি। পাচারের অর্থ ফেরত আনার লক্ষ্যে কোনো দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকুয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো যায়নি। কোনো আসামিকে বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া যায়নি। আদালতের আদেশ অনুযায়ী আসামির সম্পদ ক্রোক বা ফ্রিজ করা হয়নি। জোরদার হয়নি দুদকের গোয়েন্দা অনুসন্ধানও।

ফাঁদ পেতে (ট্র্যাপ) ঘুষখোর গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করাও সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে শুধু এনফোর্সমেন্ট ইউনিট মাঝে মাঝে দু-একটি অভিযান চালাচ্ছে। আটকে আছে উচ্চ পদে পরিচালক ও মহাপরিচালকদের পদোন্নতি এবং বদলি। বর্তমানে ১০টি পরিচালক পদ খালি থাকলেও উপপরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি দিয়ে ওইসব শূন্য পদ পূরণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ প্রয়োজনে ১০ লাখ টাকার বেশি কেনাকাটাও সম্ভব হচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিবেচনা ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন কমিশন নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) চেয়ারম্যান ড. ইফতেখারুজ্জামান। দুদকে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় এমন কমিশন গঠনের আহ্বান জানান তিনি, যাতে সংস্থাটি স্বার্থ ও দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্নীতি দমন করতে পারে এবং মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দুদকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সংস্থাটিকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়ার কারণে কমিশন কখনোই প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেনি।”

তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া কমিশনারেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা করণীয় নির্ধারণেও নানাভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে বড় আকারের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের তথ্য ও সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তদন্তের উদ্যোগ না নেওয়া, আবার দায়সারা উদ্যোগ নিলেও পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেওয়ার নজির তৈরি করেছে দুদক। অন্যদিকে ক্ষমতার বাইরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে।”