৩৬ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের নানা হিসাব নিকাশ

Sadek Ali
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৯:৫৩ অপরাহ্ন, ১১ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৯:৫৫ অপরাহ্ন, ১১ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • ২০ আগস্ট বেলা দুইটা থেকে চারটা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ
  • ভোটের জন্য ইসির সংসদ অধিবেশন আহ্বান, কাল মনোনয়ন দাখিল
  • নির্বাচনে দলের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল: চীফ হুইপ
  • বিরোধী প্রার্থী থাকায় নির্বাচনে বাড়ছে রাজনৈতিক তাৎপর্য
  • এটা গণতন্ত্রের জন্য মানানসই: শাহদীন মালিক 
  • গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক:  বদিউল আলম

দীর্ঘ ৩৬ বছর পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট দেবেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। এরমধ্যে বিএনপির মোট এমপি রয়েছেন ২৪৭ জন এবং জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের মোট এমপি রয়েছে ৯০ জন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর একই কক্ষে ব্যালট গণনা এবং প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হবে। পরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত ফলাফলের সরকারি গেজেট।

দীর্ঘ দিনের ব্যবধানে দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীদলীয় প্রার্থী থাকায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গতিশীলতার স্ফূরণ বলছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। তবে নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে সংসদ সদস্যদের দলীয় অবস্থান এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারাতে হবে বলে সতর্ক করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তার এই বক্তব্যের আইনি ভিত্তি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দল থেকে পদত্যাগ অথবা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার কারণে আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়েও অনুচ্ছেদটির মূল ভাষা হিসেবে দলের বিরুদ্ধে সংসদে ভোট দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: বন্ধ তিন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল চালু করতে চুক্তি সই, বিনিয়োগ হবে ৬১৯ কোটি টাকা

এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মঙ্গলবার বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, সংবিধানের বিদ্যমান বিধান বিবেচনায় চিফ হুইপের বক্তব্যের আইনি ভিত্তি রয়েছে। তার ভাষ্য, এক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো এমপি অন্য দলের প্রার্থীকে ভোট দিলে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রশ্ন উঠতে পারে। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ভোট হবে,  এই ভোট সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছে এমনটা নির্ধারিত হয়ে থাকলেও এটা গণতন্ত্রের জন্য মানানসই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারও মনে করেন, ৭০ অনুচ্ছেদের বর্তমান কাঠামোর কারণে দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তার মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে সংস্কার থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর সুযোগ থাকত। তবে দীর্ঘ বিরতির পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিরোধী প্রার্থী থাকায় নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়া গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক দিক বলেও তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুন: পাহাড় ঘিরে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে, ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

২০ আগস্ট সংসদে ভোট: মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রেস ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ও ভোটগ্রহণের বিস্তারিত প্রক্রিয়া তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। এর আগে সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্পিকার, সরকারদলীয় চিফ হুইপ, বিরোধী দলের চিফ হুইপ, সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে ভোটগ্রহণের স্থান ও সময়, ব্যালট বিতরণ, ভোটগ্রহণ, গণনা এবং ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে। সংসদ সদস্যরা তাঁদের নির্ধারিত আসনে বসেই ভোট দেবেন। নির্বাচন কমিশনের সহায়ক কর্মকর্তারা তাঁদের কাছে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন। ভোটগ্রহণের জন্য রাখা হবে তিনটি ব্যালট বাক্স। সংসদ সদস্যরা তাঁদের সুবিধাজনক যেকোনো একটি বাক্সে ভোটপত্র জমা দিতে পারবেন। কোনো সংসদ সদস্য অনিবার্য কারণে কিছুটা দেরিতে পৌঁছালেও যাতে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

অধিবেশন কক্ষেই ব্যালট গণনা: ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধিবেশন কক্ষেই শুরু হবে ব্যালট গণনা। এ জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মী নিয়োজিত থাকবে। গণনায় ঠিক কতজন কর্মকর্তা থাকবেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। ভোট শেষে মোট কতটি ব্যালট পড়েছে, কতটি বৈধ হয়েছে এবং কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেনগণনার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হবে। গণনা শেষে সংসদ ভবনেই প্রাথমিক ফল ঘোষণা করবেন নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এরপর নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে চূড়ান্ত ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হবে।

ব্যালটে থাকবে প্রার্থীদের নাম: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপার প্রস্তুত ও ছাপানোর কাজও এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ইসি সচিব জানান, ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে। এক অংশে থাকবে ব্যালটের ক্রমিক নম্বর, ভোটদাতার নাম, বিভক্তি নম্বর এবং ভোটদাতার স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত স্থান। অপর অংশে থাকবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম। নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নামের পাশে ভোটদাতা তাঁর পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোট দেবেন। ব্যালট পেপার নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ছাপানো হবে, ফলে প্রার্থীদের নাম মুদ্রণের ক্ষেত্রে ভুলের সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

ইসির ২০ কর্মকর্তা, সংসদ থেকেও সহায়তা: ভোটগ্রহণের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে ২০ জন সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হবে। তাদের জন্য পৃথক পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি সংসদ সচিবালয় থেকেও প্রয়োজনীয়সংখ্যক সহায়ক কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। নির্বাচন কমিশনের কোনো কমিশনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রত্যক্ষ করতে চাইলে তাদের নামও সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হবে। তারা সেখানে উপস্থিত থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। সংবাদকর্মীদের জন্যও সংসদ ভবনে নির্ধারিত স্থান থাকবে। সেখান থেকে তারা ভোটগ্রহণ, ব্যালট গণনা এবং প্রাথমিক ফল ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও থাকবে।

দলীয় নির্দেশ বনাম সংবিধানের ৭০: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছেন, সংসদ সদস্যরা নিজ দলের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন না। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর রয়েছে। চিফ হুইপের এই বক্তব্যের পেছনে মূলত সংবিধানের সেই বিধানই রয়েছে, যেখানে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যাতেও ৭০ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য হিসেবে সংসদীয় স্থিতিশীলতা ও দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের কোনো আইন, প্রস্তাব বা সরকারের আস্থা নির্ধারণকারী ভোট নয়। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো এমপি দলীয় প্রার্থীর বাইরে ভোট দিলে সেটি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ‘সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট’ হিসেবে কীভাবে গণ্য হবে—এ প্রশ্নই এখন সাংবিধানিক বিতর্কের কেন্দ্রে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক দলের নির্দেশনা নয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং ভোটের সাংবিধানিক প্রকৃতি—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

১৯৯১-এর পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর অনুষ্ঠিত ওই পরোক্ষ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করেন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। ৩৩০ সদস্যের সংসদে ৬৬ জন ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। এরপর সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। ফলে প্রায় ৩৬ বছর পর ২০২৬ সালের নির্বাচনটি শুধু নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই নয়, বরং দীর্ঘ বিরতির পর সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে যাচ্ছে।

অলি আহমদ বনাম বিএনপির প্রার্থী: এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনৈতিক চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে  এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে  বিএনপি তাদের দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। তবে দলীয় সূত্রের বরাতে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার কথা জানা গেছে। বিএনপি ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় বৃহস্পতিবার। বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত কখন হবে এ প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলে সবাই জানতে পারবেন। মনোনয়ন ফরম দাখিলের সময়ই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

সরাসরি সম্প্রচার হবে ভোট ও ফল: রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ভোট দেওয়ার সময় তা টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ। ভোট গণনা থেকে শুরু করে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াও সরাসরি সম্প্রচারের আওতায় থাকবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবার শুধু সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; সংসদীয় রাজনীতিতে দলীয় শৃঙ্খলা, এমপিদের ভোটাধিকার, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সীমা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের গণতান্ত্রিক তাৎপর্য-সবকিছুরই পরীক্ষা হতে যাচ্ছে ২০ আগস্টের ভোটে।

গণতন্ত্রের পরীক্ষাও ২০ আগস্ট: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন না; সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে ৩৪৯ জন এমপির প্রত্যেকের ভোটই হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। এবার বিরোধী প্রার্থী থাকায় ভোটের রাজনৈতিক তাৎপর্যও আগের তুলনায় বেশি। একদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত ও সংসদীয় শৃঙ্খলা, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য-দুটি প্রশ্ন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়াটিই গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। তার ভাষায়, কোনো পদে নির্বাচন হওয়া এবং সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিতে সংস্কার থাকলে দলীয় নির্দেশনা ও এমপিদের ব্যক্তিগত ভোটের অধিকার নিয়ে এ ধরনের সাংবিধানিক প্রশ্ন হয়তো তৈরি হতো না। তবে বিরোধী প্রার্থী থাকায় এবারের নির্বাচন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বাড়াবে বলেও তিনি মনে করেন। সব মিলিয়ে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখন শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি হতে যাচ্ছে দীর্ঘ বিরতির পর সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরীক্ষা এবং একই সঙ্গে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, দলীয় শৃঙ্খলা ও সংসদ সদস্যের ভোটের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-আইনি পরীক্ষাও। ভোটের ফল যাই হোক, ২০ আগস্টের এই নির্বাচন বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি নতুন নজির হিসেবে যুক্ত হওয়ার পথে।